হোম > বিশ্ব > ভারত

জাতপাতের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছে ছাত্রসমাজ, শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ঘিরে উত্তাল ভারত

বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা

আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের বিশ্বমঞ্চে ভারত নিজেদের যত বড় পরাশক্তি হিসেবেই দাবি করুক না কেন, দেশটির অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা এখনও প্রাচীন বর্ণপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্যের খাঁচায় বন্দি। জাতপাত ও ধর্মীয় বিদ্বেষ যেন দেশটিকে ক্রমশ প্রাচীন ও অন্ধকার যুগের দিকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ (আইআইটি) বম্বের দলিত শিক্ষার্থী সাহিল ওয়াকোড়ের আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশটির ছাত্রসমাজ।

মেধার সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও প্রান্তিক শ্রেণির এই মেধাবী তরুণকে শেষ পর্যন্ত জাতপাত এবং প্রশাসনিক হেনস্তার শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাহিলের পরিবারের দাবি, পরীক্ষায় নকল করার মিথ্যে অজুহাত তুলে এক অধ্যাপক তার প্রতি জাতপাতভিত্তিক চরম অপমানজনক মন্তব্য করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে তাকে পদ্ধতিগত মানসিক নিপীড়নের মুখে রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে সাধারণ নিয়মভঙ্গ ও পড়াশোনার চাপের আড়ালে ঢাকার চেষ্টা করলেও এর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে শিক্ষার্থীরা।

এই ট্র্যাজেডি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ভারতের অভিজাত ক্যাম্পাসগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। এর আগে ২০১৬ সালে হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রোহিত ভেমুলার তথাকথিত ‘প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা’ দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। সে সময় প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কেবল আনুষ্ঠানিক কাগুজে কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

শিক্ষার্থী মহলের অভিযোগ, আইআইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলিত, আদিবাসী এবং ওবিসি শিক্ষার্থীদের কথা শোনার বা তাদের অভিযোগ সমাধানের কার্যকর ও সংবেদনশীল কোনো মঞ্চ নেই। উল্টো প্রশাসনের তৈরি করা তদন্ত কমিটিগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি ধামাচাপা দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার পক্ষেই সাফাই গায়। যেকোনো প্রতিবাদ দমন করতে সার্বক্ষণিক প্রশাসনিক নজরদারি ও শাস্তির ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ করে রাখা হচ্ছে।

মৃত্যুর পরিসংখ্যান ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার এক শিউরে ওঠা অন্ধকার চিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। হিন্দুস্তান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গত দুই দশকে ভারতের বিভিন্ন আইআইটি ক্যাম্পাসে মানসিক ও সামাজিক চাপে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৭১ জন শিক্ষার্থী। উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রথম দশকে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ৫১, যা পরবর্তী দশকে এক লাফে ১২০-এ গিয়ে পৌঁছেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে সাম্প্রতিক তথ্যে, যেখানে দেখা যাচ্ছে কেবল গত ৫ বছরেই আইআইটিগুলোতে ৬৬ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর এই ক্রমবর্ধমান হার অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, ক্যাম্পাসগুলোর বাণিজ্যিকীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সংকোচনের সাথে সাথে দলিত, আদিবাসী ও অনগ্রসর শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা আগের চেয়ে বহুগুণ কঠিন ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। শিক্ষাঙ্গনে ‘মেধা’র ধারণাকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস টিকিয়ে রাখা হচ্ছে, যার ফলে প্রান্তিক পরিবার থেকে উঠে আসা প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা শহরের বড় বড় শিক্ষাঙ্গনে গিয়ে চূড়ান্ত মানসিক একাকীত্ব ও বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।

ক্যাম্পাসগুলোতে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রভাব কতটা গভীরে শিকড় গেড়েছে, তার নজির মিলছে সাম্প্রতিক নানা পদক্ষেপে। কয়েক বছর আগেই আইআইটি বম্বের হোস্টেল ডাইনিংয়ে নিরামিষ ও আমিষভোজীদের জন্য আলাদা বসার জায়গা নির্দিষ্ট করে কার্যত খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি আইআইটি মান্ডির ক্যাম্পাসে এমন পোস্টারও প্রকাশ্যে আসে যেখানে চার বর্ণের কাঠামো তুলে ধরে শূদ্রদের কাজ অন্য তিন বর্ণের সেবা করা বলে উল্লেখ করা হয়।

তীব্র প্রতিবাদের মুখে কর্তৃপক্ষ দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও ওই ক্যাম্পাসের শীর্ষ প্রশাসনের সাথে ধর্মীয় গোষ্ঠীর (ইসকন) সংশ্লিষ্টতা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তিন ক্রেডিটের ‘গীতা কোর্স’ বাধ্যতামূলক করার মতো বিষয়গুলো এই বৈষম্যমূলক মানসিকতারই প্রমাণ দেয়। আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণার চেয়ে গোমূত্র, আয়ুর্বেদ বা প্রাচীন বেদান্ত শাস্ত্রকে ‘বিজ্ঞান’ প্রমাণ করার একমুখী ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রবণতা বিজ্ঞান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্যকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের করপোরেট ও অভিজাত কাঠামো সামাজিক অন্তর্ভুক্তির পরিবর্তে নির্দিষ্ট উচ্চবর্ণীয় আধিপত্য ধরে রাখতে মেধার বুলি আওড়াচ্ছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি নিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে সুবিধাভোগী শ্রেণি উন্নত বিশ্বের করপোরেট দুনিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছে, অন্যদিকে সংবিধানের মূল কারিগর বাবাসাহেব আম্বেদকরের মতাদর্শ প্রচার বা প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা ক্যাম্পাসগুলোতে কার্যত অপরাধে পরিণত হয়েছে।

আধুনিকতা ও ডিজিটাল ভারতের স্লোগান দেওয়া হলেও, গভীরে প্রোথিত জাতপাতের শিকল ও ধর্মীয় আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্ব ভারতের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোকে ক্রমশ শ্বাসরুদ্ধকর বধ্যভূমিতে পরিণত করছে। সাহিল ওয়াকোড়ের মৃত্যুর পর সুবিচারের দাবিতে শুরু হওয়া এই ছাত্র আন্দোলন আজ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ এবং জাতিগত নিপীড়ন বন্ধের বাস্তব পদক্ষেপ ছাড়া ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার এই পতন ঠেকানো অসম্ভব।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পেতে ভারতের দৌড়ঝাঁপ

গোপনে ভিডিও ধারণে সক্ষম স্মার্ট চশমা নিয়ে নতুন আইনি প্রশ্ন

আসামে ১৪০০ মুসলিম পরিবারের বাড়িঘর উচ্ছেদ, নেপথ্যে আদানির বিদ্যুৎ প্রকল্প

ভারতে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো শতবর্ষী কবরস্থান

পরীক্ষার হলে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার, ধরা পড়ার পর আইআইটি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

১৮ জনকে মালদায় এনে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা

পর্ষদের দ্বন্দ্বে গভীর সংকটে ভারতের টাটা গ্রুপ

বদলে গেল মমতার দলের নাম, পেল নতুন প্রতীক

মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ করায় তৃণমূল নেত্রীর বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা

মদ খাওয়ার টাকা দাবি, না দেওয়ায় উত্তরপ্রদেশে মুসলিম ব্যবসায়ীকে মারধর