ভারতের প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক ও কবি ডা. কামাল হোসেন ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
শনিবার ভারতের স্বাধীনতা দিবসের দিন সকাল ৭টায় তিনি মারা যান। তার বয়স উল্লেখ করা হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন ডা. কামাল হোসেন। গত ১ আগস্ট তীব্র স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল।
তার মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য ও চিকিৎসক মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মুর্শিদাবাদের বহরমপুর থেকে উঠে আসা ডা. কামাল হোসেন ছিলেন একজন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব। তার সহোদর কবি নাসের হোসেনও বিদ্বৎসমাজে পরিচিত ছিলেন। তার বোন সোনালীও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। তার ছেলে কুণাল হোসেন একজন অধ্যাপক।
সাহিত্য ও চিকিৎসায় অনন্য ভূমিকা
স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম লেখক ও কথাসাহিত্যিকের সংখ্যা যখন তুলনামূলকভাবে কমে গিয়েছিল, তখন ডা. কামাল হোসেন নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, আবু আতাহার ও আবদুল আযীয আল-আমান প্রমুখের পরবর্তী প্রজন্মের লেখক হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তার ছোটগল্প ও বইয়ে স্বাধীনোত্তর মুসলিম সমাজ ও পরিবারের নানা সংকট উঠে এসেছে। তবে তার লেখার পরিধি শুধু একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বৃহত্তর বাঙালি সমাজ ছিল তার লেখার অন্যতম প্রধান বিষয়।
বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও পাক্ষিক পত্রিকায় তার অসংখ্য প্রবন্ধ, ছোটগল্প ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘পরিবর্তন’, ‘শিলাদিত্য’, ‘সাপ্তাহিক বর্তমান’ ও ‘কলম’ উল্লেখযোগ্য।
১৯৭৯ সালে বুদ্ধদেব বসু ও প্রতিভা বসুর ‘কবিতা ভবন’ থেকে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অন্য প্রকাশ’ প্রকাশিত হয়।
তার উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ ও অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘উপকথার জন্মবৃত্তান্ত’, ‘মর্ত্যে তিন পরি’, ‘শীতঘুম’, ‘আকলির নীল স্বর্গ’, ‘ফেরিওয়ালার দিন’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’, ‘পর্যটন’, ‘সুকুর আলির ২৪ ঘণ্টা’, ‘প্রেমের গল্প’ ও ‘শরীরের মানচিত্র’।
উপন্যাসেও সাফল্য
উপন্যাস সাহিত্যেও ডা. কামাল হোসেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
১৯৯০ সালে প্রকাশিত তার উপন্যাস ‘পরম বিশ্বাসের গন্ধ’ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার লাভ করে।
তার আরেক পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘বাণপ্রস্থ’ বাংলা উপন্যাসের ধারায় একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ‘দ্বীপভূমি’ উপন্যাসটি লাভ করে প্রমা পুরস্কার।
এ ছাড়া ‘শিকড়ের প্রবাহ’সহ আরো কয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। তার তীব্র স্যাটায়ারধর্মী উপন্যাস ‘স্বভূমি’ মানুষ ও সমাজের নানা ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করেছে।
কবিতাতেও ছিল মুন্সিয়ানা
কবিতাতেও ডা. কামাল হোসেনের স্বতন্ত্র পরিচয় ছিল। তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘সীমান্তের মানুষ’।
এরপর প্রকাশিত হয় ‘তুমি একা নও’, ‘পাতাল নির্মাণ’, ‘পহেলগাঁও কবিতাগুচ্ছ’, ‘লাফিংবুদ্ধ’, ‘চ্যাপলিনের নতুন ঠিকানা’, ‘শুভ বিবাহ’, ‘দাহ’, ‘তোমার মগ্ন হেঁটে যাওয়া’ এবং ‘নির্বাচিত প্রেমের কবিতা’।
তার লেখায় মুসলিম সমাজ ও পরিবারের সংকট যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বৃহত্তর বাঙালি সমাজের নানা বিষয়ও স্থান পেয়েছে। ফলে তার সাহিত্য বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের পাঠকের কাছেই জনপ্রিয়তা লাভ করে।
চিকিৎসক হিসেবেও মানুষের পাশে
সাহিত্যের পাশাপাশি পেশাগত জীবনেও মানুষের সেবায় যুক্ত ছিলেন ডা. কামাল হোসেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন।
মাদার টেরেসার একটি প্রতিষ্ঠানে তিনি রোগী দেখতেন। উত্তর ২৪ পরগনার একটি ক্লিনিকেও গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত বসতেন।
সাহিত্য ও চিকিৎসা—দুই ক্ষেত্রেই বড় মাপের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে অহংকার ছিল না বলে তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত সহজভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতেন।
চার বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন
২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর প্রথমবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হন ডা. কামাল হোসেন। এরপর প্রায় চার বছর ধরে ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগোচ্ছিলেন তিনি।
তবে গত ১ আগস্ট আচমকা তীব্র স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল তাকে।
অবশেষে শনিবার স্বাধীনতার দিনে সকাল ৭টায় তার জীবনাবসান ঘটে।
‘পুবের কলম’-এর বিশিষ্ট লেখক
ডা. কামাল হোসেন ‘পুবের কলম’ পত্রিকার একজন বিশিষ্ট লেখক ছিলেন। নিজ নামে ও ছদ্মনামে তার বহু লেখা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রাক্তন সংসদ সদস্য ও ‘পুবের কলম’-এর সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান। তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন। একই সঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সবর বা ধৈর্য ধারণের জন্য দোয়া করেছেন।
ডা. কামাল হোসেনের মৃত্যুতে তার শুভানুধ্যায়ী, পাঠক ও গুণগ্রাহীরাও গভীর বেদনা প্রকাশ করেছেন।
এএম