হোম > বিশ্ব > ভারত

ভারতে আটক বিক্ষোভকারীদের বাড়ি ফেরাতে এআইয়ের সহায়তা নিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা

আলজাজিরা

নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ এক তরুণ বিক্ষোভকারীকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। ছবি: আলজাজিরা

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আটক ব্যক্তিদের শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে পুলিশ। এরপর অপরিচিত জায়গা থেকে বাড়ি ফিরতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন অনেকে। তাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন একদল স্বেচ্ছাসেবক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল মানচিত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য কাজে লাগিয়ে তারা আটক বিক্ষোভকারীদের অবস্থান শনাক্ত করছেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করছেন। রাজীব চৌধুরী নামের ২৫ বছর বয়সি এক তরুণের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এই ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে বিশেষ করে নারী, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক বিক্ষোভকারীদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি পুলিশের হাতে আটক হওয়া ১৯ বছর বয়সি এক তরুণী এ উদ্যোগের সহায়তা পেয়েছেন। গত রোববার নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভ চলাকালে তাকে আটক করে পুলিশ। পরে কয়েকজন বিক্ষোভকারীর সঙ্গে একটি বাসে তুলে শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে নামিয়ে দেওয়ার পর তার হাতে টাকা ছিল না, মোবাইলফোনের চার্জও শেষ হয়ে গিয়েছিল। অন্ধকার সড়কে প্রায় এক ঘণ্টা দিশাহারা হয়ে ঘোরেন তিনি।

একপর্যায়ে একটি গাড়ি থামে। চালক জানতে চান, তার সাহায্য লাগবে কি না। গাড়িতে থাকা এক স্বেচ্ছাসেবককে আগে অনলাইনে ভিডিওতে দেখেছিলেন ওই তরুণী। আটক বিক্ষোভকারীদের সহায়তা চেয়ে ওই ব্যক্তি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। তাকে চিনতে পেরে গাড়িতে ওঠেন তরুণী। পরে স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় নিরাপদে বাড়ি ফেরেন তিনি।

হয়রানির আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই তরুণী আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমি ভীত ছিলাম, পুরোপুরি দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম। স্বেচ্ছাসেবকেরা যখন শেষ পর্যন্ত আমাকে নিরাপদে ফিরতে সাহায্য করলেন, তখন মনে হয়েছিল, এটা যেন অলৌকিক ঘটনা। কখনো ভাবিনি, আগে কখনো দেখা হয়নি এমন কেউ এভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবেন।’

নয়াদিল্লিতে রাতে একা রাস্তায় থাকা কিংবা অপরিচিত মানুষের গাড়িতে ওঠা নারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। শহরটি ভারতে ‘ধর্ষণের রাজধানী’ নামে পরিচিত। সেখানে গড়ে প্রতিদিন তিনটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তাই পরিচিত মুখ দেখে আশ্বস্ত হওয়ার বিষয়টি ওই তরুণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এআই ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত উদ্যোগ

আটক বিক্ষোভকারীদের বাড়ি ফেরানোর এই উদ্যোগের নাম ‘ডিটেইনি ঘরওয়াপসি যোজনা’। হিন্দি ভাষায় ‘ঘরওয়াপসি’ অর্থ বাড়ি ফেরা এবং ‘যোজনা’ অর্থ পরিকল্পনা। উদ্যোগটি পরিচালনা করছেন ২৫ বছর বয়সি রাজীব চৌধুরী। তার সঙ্গে কাজ করছেন এক নামেই পরিচিত সাংবাদিক মেঘনাদ।

এই উদ্যোগে একটি ব্যক্তিগত ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবকদের নেটওয়ার্ক যুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের বাসের নম্বর ও অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্য মাঠপর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবকেরা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। এআইয়ের সহায়তায় এসব তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং সরাসরি মানচিত্রে অবস্থান চিহ্নিত করে সমন্বয় করা হয়। এরপর যারা শহরের বাইরে আটকে পড়েন, তাদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়।

চৌধুরী বলেন, তাদের নেটওয়ার্কের প্রধান লক্ষ্য অপ্রাপ্তবয়স্ক, বয়স্ক ব্যক্তি ও নারীদের সহায়তা করা। তাদের অনেকেই প্রথমবারের মতো বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।

শুরুতে চৌধুরী ও মেঘনাদ অল্প কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। আটক বিক্ষোভকারীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা ও চিকিৎসার জন্য সহায়তা করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। পরে এই নেটওয়ার্কে স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা বেড়ে ১৩০ ছাড়িয়েছে। তারা নিজেদের সময় ও সম্পদ ব্যয় করে আটক বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

চৌধুরী বলেন, ‘বিক্ষোভে আটক হওয়া মানুষের দুর্ভোগ আটকের মধ্যেই শেষ হয় না। তাদের ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। এরপর অপরিচিত জায়গা থেকে বাড়ি ফেরার পথ খুঁজতে হয়। অনেক সময় বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কিংবা যাতায়াতের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।’

বিক্ষোভ থেকে উদ্যোগের সূচনা

এর আগে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা একটি বিক্ষোভে সরঞ্জাম ও স্বেচ্ছাসেবক জোগাড়ে সহায়তা করেছিলেন চৌধুরী। যন্তর মন্তর ছিল রাজধানীর নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল। পরে কর্তৃপক্ষ সেখানকার বিক্ষোভস্থলের স্বীকৃতি বাতিল করে।

বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় চৌধুরী বুঝতে পারেন, আটক হওয়ার পর শহরের বাইরে ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তিদের জন্য আরো সুসংগঠিত সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা প্রথমবার বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন, তাদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করা জরুরি।

গত ২ অক্টোবর নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হলে আগের স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলেন তিনি। শুরুতে একটি সাধারণ স্প্রেডশিট দিয়ে কাজ শুরু হয়। পরে এআইয়ের সহায়তায় তথ্য ব্যবস্থাপনা, অবস্থান শনাক্ত করা এবং সহায়তার সমন্বয় করা হয়।

চৌধুরী বলেন, ‘এই ব্যবস্থা তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল, যেসব কাজ এখনো সুশৃঙ্খলভাবে করা হয় না, সেগুলোকে একটি ব্যবস্থার মধ্যে আনা। আমরা এমন একটি সহায়তা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চেয়েছি, যা মানুষের দাবির পক্ষে লড়াইয়ে তাদের পাশে থাকতে পারে।’

একবার নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে আটক হয়ে শহরের উপকণ্ঠে ছেড়ে দেওয়া এক নারীর কাছ থেকে সাহায্যের আবেদন পান চৌধুরী। ওই নারী একটি রেলস্টেশনের কাছে আটকে পড়েছিলেন। মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ থাকায় এবং বাড়ি ফেরার পথ বুঝতে না পেরে তিনি ভীত হয়ে পড়েন। পরে চৌধুরীর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কাছাকাছি থাকা এক নারী চালককে পাঠিয়ে তাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

চৌধুরী বলেন, ‘অপরিচিত শহরে মানুষকে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা খুবই কষ্টের। তারা ভীত থাকেন, বুঝতে পারেন না কীভাবে বাড়ি ফিরবেন।’

বিক্ষোভ ঘিরে কঠোর ব্যবস্থা

চলতি মাসের শুরু থেকে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও তার কমিশনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ হচ্ছে। ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তার পদত্যাগ দাবি করছেন বিক্ষোভকারীরা।

ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টি, বামঘেঁষা কয়েকটি ছাত্রসংগঠন এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতৃত্বে এসব বিক্ষোভ হচ্ছে। নয়াদিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে কয়েক দশ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছেন।

বিক্ষোভের জবাবে রাজধানীতে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। সড়ক বন্ধ করা হয়েছে, মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে এবং হাজারো মানুষকে আটক করা হয়েছে। ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য এই বিক্ষোভকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ মুহূর্তে ‘ডিটেইনি ঘরওয়াপসি যোজনা’ শুধু নয়াদিল্লিতে কাজ করছে। তবে ভবিষ্যতে অন্য শহরেও এ উদ্যোগ ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে চৌধুরীর।

তিনি বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবক ও চালকেরা যেভাবে এগিয়ে এসেছেন, তাতে আমি অভিভূত। তারা কোনো টাকা না নিয়েই সেবা দিচ্ছেন। বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়াতে চান বলেই তারা বিনা মূল্যে সাহায্য করছেন।’

চৌধুরীর দলের সহায়তায় বাড়ি ফেরা ১৯ বছর বয়সি তরুণী উদ্যোগটিকে বিক্ষোভকারীদের জন্য ‘জীবনরক্ষাকারী সহায়তা’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, দলটি শুধু বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করেনি, তাকে মানসিক সাহসও দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করতে পারব না। আমাদের সমাজে যত দিন এ ধরনের মানুষ থাকবেন, তত দিন কোনো কর্তৃপক্ষই আমাদের অধিকার আদায়ের দাবি জানানো ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করা থেকে থামাতে পারবে না।’

এএম

‘দুর্গাপুজো’ বনাম ‘শারদোৎসব’—পশ্চিমবঙ্গজুড়ে শারদীয় বুক স্টল ভাঙচুর ঘিরে উত্তেজনা

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর ঘিরে বিতর্ক, চাপে ওয়াশিংটন-দিল্লি সম্পর্ক

ভারতের সিইসির পদত্যাগ দাবিতে এবার লন্ডনে বিক্ষোভ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান

ভারতে মন্দিরে যাওয়ার পথে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত ১২, আহত ২৭

কলকাতায় পূজামণ্ডপে পদদলিত হয়ে নিহত ১৯

ভারত ছাড়ার নোটিশ বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে অভিনেতা ইমরান খান

ককরোচ প্রধান অভিজিৎকে মুক্তির নির্দেশ আদালতের

শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের

ভারতের গুজরাটে কারখানায় বিস্ফোরণ, নিহত ৫

ইন্ডিয়া জোটের বিক্ষোভে যোগ দিল থালাপতি বিজয়ের দল