ভারতের হিমাচল প্রদেশে দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া ৯টি হিমবাহ হ্রদকে ‘পানির বোমা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আইআইটি মান্ডির গবেষকরা। হিমালয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহ গলার হার বাড়তে থাকায় এসব হ্রদ ভাটির জনপদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।
গবেষকদের এই সতর্কতা এসেছে নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রেক্ষাপটে। ওই বন্যার সূত্রপাত একটি বিশাল হিমবাহের অংশ ভেঙে হিমবাহ হ্রদে পড়ে সেটি উপচে পড়ার কারণে হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
আইআইটি মান্ডির গবেষকরা জানান, স্যাটেলাইট চিত্র ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এক দশকে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ হ্রদের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে এসব হ্রদের আয়তনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেওয়া আইআইটি মান্ডির স্কুল অব সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডেরিকস পি. শুক্লা বলেন, হ্রদগুলোর প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে আকস্মিক ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। এতে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।
গবেষণায় চাম্বা ও লাহৌল-স্পিতির উচ্চ পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত কালিকুন্ড, চন্দ্রতাল, বাসুকি, সুরাই, কিয়া সো, ইয়োচে, সমুদ্র তাপু, কাসাং ও গেপাং গাথ—এই ৯টি হ্রদকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিক প্রতিরোধক বাঁধ ভেঙে গেলে এসব হ্রদ ‘পানির বোমার’ মতো আচরণ করতে পারে।
ভূমিধস, ভূমিকম্প কিংবা অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে গেলে নিচের উপত্যকাগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব হ্রদের সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে ১৫টির বেশি সেতু, কয়েকটি জনবসতি এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হিমাচল প্রদেশে ৩ হাজার ৫০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় মোট ২ হাজার ৭৬টি হিমবাহ হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছে। ২০১৫ সালের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ৭১০টি বেশি। একই সময়ে এসব হ্রদের সম্মিলিত আয়তন ২৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। এতে রাজ্যটিতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে লাহৌল-স্পিতির গেপাং গাথ হ্রদের আয়তন প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার বর্গমিটার বেড়েছে। কাসাং হ্রদের আয়তন বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটার, আর কাংড়া ও চাম্বার কালিকুন্ড হ্রদ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটার।
গবেষকেরা কালিকুন্ড হ্রদকে বিশেষভাবে সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ, হ্রদটির চারপাশের ঢাল অত্যন্ত খাড়া হওয়ায় সেখানে হঠাৎ ভূমিধস বা প্রাকৃতিক বাঁধ ধসে পড়ার ঝুঁকি বেশি।
গবেষণায় হিমবাহ গলার গতি বাড়ানোর পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, হিমালয়ের সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার ফলে হিমবাহের ওপর ধুলাবালির আস্তরণ তৈরি হতে পারে। স্বচ্ছ বরফ ও তুষারের তুলনায় এই ধুলা বেশি সূর্যালোক শোষণ করে, ফলে হিমবাহ দ্রুত গলতে পারে।
এ ছাড়া ভূমিকম্প ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিমবাহ হ্রদের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।
এ ছাড়া হিমালয় অঞ্চলের ৬৮১টি হিমবাহ হ্রদের পানি প্রবাহের সম্ভাব্য পথ ও ভাটির ঝুঁকি মূল্যায়ন করবে কেন্দ্রীয় পানি কমিশন। একই সঙ্গে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ হিমবাহ হ্রদগুলোর ঝুঁকি শ্রেণিবিন্যাসের জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির কাজ করবে।
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া
এমএমআর