জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার প্রচেষ্টা আরো জোরদার করেছে ভারত। এবার দেশটির দাবির প্রতি সম্মিলিত সমর্থন জানিয়েছে মধ্য ইউরোপের চার দেশ—হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র। এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশক ধরে চলে আসা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের আলোচনায় ভারতের পক্ষে নতুন কূটনৈতিক সমর্থন যুক্ত হলো।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রথমবারের মতো ভিসেগ্রাদ গ্রুপ বা ভি৪-এর সঙ্গে ভারতের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন জানায় জোটটির চার সদস্য রাষ্ট্র।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর স্লোভাকিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুরাজ ব্লানার বলেন, গ্লোবাল সাউথের গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উদীয়মান শক্তি হিসেবে ভারতকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে ভি৪-এর দেশগুলো একমত।
ভারতের যুক্তি, ১৯৪৫ সালে নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিষ্ঠার সময়কার বিশ্বের সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। সে সময় এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। বর্তমানে জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক দেশ তখন স্বাধীন রাষ্ট্রও ছিল না। ফলে নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামোকে বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি জানিয়ে আসছে নয়াদিল্লি।
ভারত এখন পর্যন্ত আটবার নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। সর্বশেষ ২০২১ ও ২০২২ সালে দেশটি পরিষদের সদস্য ছিল। দেশটির স্থায়ী সদস্যপদের দাবির পক্ষে জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথা তুলে ধরা হয়। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, উন্নয়ন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক শান্তির মতো বিভিন্ন ইস্যুতেও ভারত সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদকে সামনে রেখে প্রকাশিত অগ্রাধিকারসংক্রান্ত নথিতে ভারত বলেছে, বিভিন্ন সংঘাতে কার্যকরভাবে সাড়া দিতে জাতিসংঘের ব্যর্থতা সংস্থাটির কার্যকারিতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাই নয়াদিল্লির কাছে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বিষয়টি শুধু ভারতকে স্থায়ী সদস্য করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে পুরো কাঠামোকে আরও কার্যকর করার বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত।
ভারতের দাবির প্রতি ইতোমধ্যে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সমর্থন জানিয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে চীন এখনো ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের পক্ষে সরাসরি সমর্থন দেয়নি। বেইজিং বলে আসছে, তারা ভারতের আকাঙ্ক্ষাকে বোঝে ও সম্মান করে; একই সঙ্গে এ বিষয়ে আরো ব্যাপক ঐকমত্যের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করে।
ভারত ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপানের সঙ্গে জি৪ জোটের সদস্য। জোটের চার দেশ পরস্পরের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করে এবং নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের আলোচনায় নিজেদের অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় করে। জি৪-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান ১৫ সদস্যের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৫ বা ২৬ করা যেতে পারে।
এই প্রস্তাবে ছয়টি নতুন স্থায়ী আসন তৈরির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি আফ্রিকা, দুটি এশিয়া-প্যাসিফিক, একটি লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং একটি পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের জন্য রাখার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি চার বা পাঁচটি অতিরিক্ত অস্থায়ী সদস্যের আসন যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
তবে নিরাপত্তা পরিষদ সম্প্রসারণের বিষয়ে বর্তমান পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য—এখনো কোনো অভিন্ন কাঠামোয় একমত হতে পারেনি। নতুন সদস্যের সংখ্যা, কোন অঞ্চল কতটি আসন পাবে, নতুন স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা দেওয়া হবে কি না এবং সংস্কারের পর পরিষদ কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব বিষয়েই মতপার্থক্য রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কগুলোর একটি ভেটো ক্ষমতা নিয়ে। বর্তমানে পাঁচ স্থায়ী সদস্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু নির্বাচিত সদস্যদের এমন ক্ষমতা নেই। আফ্রিকান ইউনিয়ন দীর্ঘমেয়াদে ভেটো ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পক্ষে। তবে ভেটো ব্যবস্থা বহাল থাকলে নতুন স্থায়ী সদস্যদেরও বর্তমান পাঁচ সদস্যের সমান অধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
ভারতের অবস্থানও প্রায় একই। ২০২৬ সালের এপ্রিলের এক বিবৃতিতে নয়াদিল্লি বলেছিল, এমন কোনো পৃথক শ্রেণির স্থায়ী সদস্য থাকা উচিত নয়, যেখানে কিছু দেশের ভেটো ক্ষমতা থাকবে অথচ অন্য স্থায়ী সদস্যরা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। ভারত ‘সবাই অথবা কেউই নয়’ নীতির কথা বলেছে। অর্থাৎ বর্তমান ও নতুন সব স্থায়ী সদস্যের সমান অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও দায়িত্ব থাকা উচিত বলে নয়াদিল্লির অবস্থান।
এদিকে ভি৪-এর সঙ্গে বৈঠককে ভারত ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন একটি অধ্যায় হিসেবে দেখছেন জয়শঙ্কর। বৈঠকটি আয়োজনের জন্য স্লোভাকিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লানারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি এটিকে ‘নতুন ঐতিহাসিক উপলক্ষ’ বলে উল্লেখ করেন।
তবে বৈঠকের আলোচনায় শুধু নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বিষয়ই ছিল না। ভারত ও ভি৪ দেশগুলো দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার বিষয়েও একমত হয়েছে। এর অংশ হিসেবে একটি বার্ষিক ব্যবসায়িক ফোরাম আয়োজন এবং দুই পক্ষের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়মিত বৈঠকের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভি৪-এর সঙ্গে কিছু বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। এর মধ্যে বার্ষিক ব্যবসায়িক ফোরাম এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক থাকবে।
ভি৪-এর সমর্থন ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত করার মতো নয়। নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বিষয়টি এখনো বহু দেশের সঙ্গে চলমান আলোচনা এবং বর্তমান স্থায়ী সদস্যদের অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে। তবে মধ্য ইউরোপের চার দেশের এই সম্মিলিত সমর্থন ভারতের দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনের পরিধি আরো বাড়াল।
জয়শঙ্করের ভাষায়, ভি৪-এর দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো এবং শিল্প, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে। ভি৪ ভবিষ্যতে কীভাবে এগোবে, সেটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হলেও ভারত তাদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগকে স্বাগত জানাচ্ছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
এআরবি