ব্যাটম্যানের মুখোশ, অফলাইন মানচিত্র আর হঠাৎ বিক্ষোভ—ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেও আন্দোলন চালিয়ে যেতে নতুন নতুন কৌশল নিচ্ছেন তরুণ বিক্ষোভকারীরা। নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলন দমনে ব্যাপক ধরপাকড়ের মুখে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী কৌশলকে প্রতিবাদের হাতিয়ার করছেন তারা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনে তরুণ বিক্ষোভকারীরা পুলিশের নজরদারি ও বাধা এড়াতে নানা পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে হাজার হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং বিক্ষোভের প্রধান কেন্দ্র জন্তর মন্তরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর আন্দোলনকারীরা বিকল্প স্থানে আকস্মিক সমাবেশ করছেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীদের গতিবিধি ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের জেরে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এই আন্দোলন চলছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দিতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আটক বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় স্বেচ্ছাসেবীরা
আন্দোলনের মধ্যে আটক ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে তাদের সহায়তা দিতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নিয়েছেন তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা। ৩৬ বছর বয়সি কনটেন্ট নির্মাতা মেঘনাদ এসের নেতৃত্বে প্রায় ১৭০ জনের একটি দল পুলিশি যানবাহনের অবস্থান অনুসরণ করছে।
স্মার্টফোনের মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে, সে তথ্য সংগ্রহ করে একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে যুক্ত করা হচ্ছে। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবী চালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় তথ্য।
আটক ব্যক্তিদের সহায়তায় যাত্রার সময় খাবার, পানি ও জ্বালানির ব্যবস্থা আছে কি না, তা যাচাই করা হয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকদেরও সঙ্গে নেওয়া হয়, যাতে যাত্রাপথে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা দেওয়া যায়।
নজরদারি এড়াতে মুখোশ ও মেকআপ
বিক্ষোভকারীদের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন করতে মুখোশ ও মেকআপ ব্যবহারের ঘটনাও সামনে এসেছে। কয়েকজন আন্দোলনকারী ব্যাটম্যানের মুখোশ পরে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। বলিউড অভিনেত্রী রিচা চাড্ডাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুখে মেকআপ ব্যবহার করে নজরদারি ক্যামেরা ও মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থী নেত্রী নেহা বোরার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। তার সঙ্গে চেহারার মিল থাকায় অন্য এক নারীকে পুলিশ ভুল করে আটক করেছিল। পরে নেহা বোরার সঙ্গে ওই নারীর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এ ছাড়া বিক্ষোভের সময় পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পরও কিছু আন্দোলনকারী পুলিশি যানবাহন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। এসব ঘটনায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের একধরনের ‘ইঁদুর-বিড়াল’ লড়াই তৈরি হয়েছে।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক
ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক থেকেই সাম্প্রতিক আন্দোলনের সূত্রপাত। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে এবং এর ফলে ক্ষমতাসীন বিজেপি সুবিধা পেতে পারে। বিশেষ করে মুসলিমসহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটাররা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি উভয়ই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত ও শনাক্ত করা যায়নি—এমন ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের অংশ হিসেবেই তালিকা সংশোধন করা হয়েছে। গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও আন্দোলন থামেনি। আন্দোলনকারীরা নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
মোদি সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
গত কয়েক মাসে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন সংগঠিত করেছে। সরকারি স্কুলের অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বিষয় নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ পরে আরো বিস্তৃত রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। এর আগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতেও আন্দোলন জোরালো হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভে শিক্ষার্থী, তরুণ কর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে। পুলিশের কঠোর অবস্থানের মধ্যেও বিক্ষোভকারীদের বিকল্প কৌশল ব্যবহার করে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তরুণদের এই আন্দোলন এখন শুধু ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং প্রতিবাদের অধিকার নিয়েও অসন্তোষ সামনে আসছে। ফলে আন্দোলন মোকাবিলায় সরকারের নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: দ্য জাপান টাইমস