‘মানুষ আমাদের সাহায্য করেছিল এবং আমরা একটি গাড়িতে উঠেছিলাম... আমি বলেছিলাম, আমাদের হাসপাতালে নিও না।’
তারা (ছদ্মনাম) নামের একজন বিক্ষোভকারী এবং তার বন্ধু ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে একটি বিক্ষোভে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন।
ঠিক তখনই মোটরসাইকেলে করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আসেন এবং জনগণের উদ্দেশ্যে চিৎকার শুরু করেন।
তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সশস্ত্র আমাদের লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি গুলি চালায়। আমরা মাটিতে পড়ে যাই।’
এই লেখায় বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
তারা ও তার বন্ধুদের একজন অপরিচিত ব্যক্তির গাড়িতে তোলা হয়েছিল। কিন্তু তারা বলছিল যে, গ্রেপ্তারের ঝুঁকির কারণে হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন তারা।
তিনি বলেন, “সব গলিপথে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ছিল, তাই আমি সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এক দম্পতিকে আমাদের ভেতরে ঢুকতে দিতে অনুরোধ করেছিলাম।”
তারা জানান, প্রায় ভোর না হওয়া পর্যন্ত তারা ওই দম্পতির বাড়িতেই ছিলেন। এরপর তাদের পরিচিত একজন চিকিৎসককে খুঁজে পান, যিনি তাদের পায়ের ক্ষত পরিষ্কার করে দেন।
এ মাসে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ফলে কী পরিমাণ হতাহত হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো জানা যায়নি।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি বা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা ইরানে চলমান আন্দোলনে ৬ হাজার ৩০১ জনের মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে। এদের মধ্যে ৫ হাজার ৯২৫ জন বিক্ষোভকারী, ১১২ জন শিশু, ৫০ জন পথচারী এবং ২১৪ জন সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
এই মানবাধিকার সংগঠনটি আরো ১৭ হাজার ৯১ জনের মৃত্যুর প্রতিবেদন অনুসন্ধান করছে। কমপক্ষে আরো ১১ হাজার আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে এই সংগঠন ধারণা করছে।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিবিসিকে বলেছেন, গ্রেপ্তারের ভয়ে হাসপাতালে গিয়ে আঘাতের চিকিৎসা নেওয়া এড়িয়ে গেছেন তারা।
বাড়িতে গোপনে চিকিৎসা করে নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা এ কারণে চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা বিবিসিকে আরো জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত রয়েছে।
তেহরানের একজন সার্জন নিমা বলেন, ৮ জানুয়ারি যখন কর্তৃপক্ষ চলমান আন্দোলনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে, তখন তিনি কাজে যাওয়ার পথে রাস্তায় অনেক তরুণকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন।
তিনি বিবিসিকে বলেন, “আহতদের একজনকে আমার গাড়ির বুটে ঢুকিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাই আমি। কারণ আমি চিন্তিত ছিলাম যে পুলিশ যদি আমাদের থামায়, তাহলে সমস্যায় পড়ব আমরা।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা তাকে থামিয়ে হাসপাতালের পরিচয়পত্র দেখে যেতে দেয় বলে জানান নিমা।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলমান এই পরিস্থিতিতে ৩ হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, তবে তাদের বেশির ভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা পথচারী, যারা ‘দাঙ্গাবাজদের’ হামলায় নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে তারা।
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন শোকরিকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলার এই সময়ে ১৩ হাজার অস্ত্রোপচার হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সৌভাগ্যবশত মানুষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং হাসপাতালগুলোর ওপর আস্থা রাখে। চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে সব আহত ব্যক্তিকে নিরপেক্ষভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এই আস্থার কারণে গত ছয় দিন ধরে বাড়িতে চিকিৎসা করা প্রায় ৩ হাজার মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন।”
তেহরানের ফারাবি চক্ষু হাসপাতালের প্রধান ডা. কাসেম ফাখরাই আরেকটি আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ইসনাকে জানিয়েছেন যে, ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত চোখে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ৭০০ রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে। প্রায় ২০০ জনকে অন্যান্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
আটই জানুয়ারির পরেই প্রায় সব রোগীকে ভর্তি করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
সাইদ বিবিসিকে বলেন, সেন্ট্রাল শহর আরাকে বিক্ষোভ চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোড়া গুলিতে তার এক বন্ধুর চোখ বিকৃত হয়ে যায়।
স্থানীয় চিকিৎসকেরা তাকে তেহরানে একটি বিশেষজ্ঞ চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছিলেন বলে জানান সাইদ।
সেখানে পৌঁছানোর পর নার্সরা চোখে আঘাত পেয়েছেন এমন বিক্ষোভকারীদের হাসপাতালের পেছন দিক দিয়ে স্টাফ লিফট ব্যবহার করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান।
সাইদের বন্ধু জানান, বিভিন্ন শহর থেকে আসা চোখে আঘাত পাওয়া এমন প্রায় ২০০ জন ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
সাইদ বলেন, “তার দুটি অপারেশন হয়েছিল। কিন্তু সার্জন তার কাছ থেকে কোনো খরচ নেননি।”
তেহরানের একজন স্বাস্থ্যসেবা কর্মী আরো জানিয়েছেন, চিকিৎসকেরা মেডিকেল রেকর্ডে গুলির ক্ষত উল্লেখ করা এড়াতে চেষ্টা করছেন। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ওপর ক্রমাগত নজর রাখছিল।
তেহরানে বিক্ষোভ চলার সময়ে পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিনা তার ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
সিনা বিবিসিকে বলেন, ‘এটা ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের হাসপাতালের মতো, এতো বেশি আহত ব্যক্তি ছিল যে কোনো কম্বল বা চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিল না’।
‘যখন আমি একজন নার্সের কাছে আমার ভাইয়ের জন্য একটি কম্বল চাইলাম, তখন তিনি আমাকে বাড়ি থেকে একটি কম্বল আনতে বললেন। কারণ আহতদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল না’।
স্বাস্থ্য বীমা ব্যবহারের জন্য আসল পরিচয়পত্রের নম্বর দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না বলে জানান সিনা।
সিনা বলেন, ‘যে কোনো মুহূর্তে নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের বাড়িতে অভিযান চালাতে পারে।’
ছোট শহরগুলোতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে যে, আহত বিক্ষোভকারীদের যেসব চিকিৎসকরা চিকিৎসা করেছেন এবং অন্যান্যরা এখন নিজেরাই নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।
ইরান হিউম্যান রাইটস বা আইএইচআর গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ইরানে তাদের সূত্রগুলো কমপক্ষে পাঁচজন চিকিৎসক এবং একজন স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে।
উত্তরাঞ্চলীয় শহর কাজভিনের একজন সার্জন ডা. আলিরেজা গোলচিনির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এই সপ্তাহে জানিয়েছে, আহত বিক্ষোভাকারীদের চিকিৎসার জন্য যখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো, তখন নিরাপত্তা বাহিনী তার বাড়িতেই তাকে মারধর করেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা