চলতি মাসে ২০২৬–২৭ অর্থবাজেটে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ ঔরঙ্গজেব স্যানিটারি পণ্য ও গর্ভনিরোধকের ওপর আরোপিত ১৮ শতাংশ বিক্রয়কর প্রত্যাহার করেন। এই করকে অনেকেই ‘পিরিয়ড ট্যাক্স’ নামে অভিহিত করতেন। ট্যাক্স প্রত্যাহার করারয় স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ ও অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর দাম কমায় দেশের জনসাধারণের মনে স্বস্তি বিরাজ করছে। খবর মিডল ইস্ট আইয়ের।
ইউনিসেফ পাকিস্তান এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি মাসিকজনিত দারিদ্র্য মোকাবিলায় একটি অর্থবহ পদক্ষেপ এবং স্যানিটারি পণ্যকে বিলাসপণ্য নয়, বরং অপরিহার্য স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতাসামগ্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিফলন।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন নারী অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার আইনজীবী মাহনুর ওমর এবং কর আইনজীবী আহসান জাহাঙ্গীর খান। তারা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সাংবিধানিক আবেদন করে যুক্তি দেন, এ কর সমতা ও মর্যাদার সাংবিধানিক নীতির পরিপন্থী।
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের আটকের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী বুশরা মাহনুর জানান, ছয়জন ঋতুমতী নারী থাকা তাদের পরিবারে স্যানিটারি প্যাড খুব হিসাব করে ব্যবহার করতে হতো। তিনি বলেন, মনে হতো, প্যাডের জন্য আমরা যেন একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছি।
মাহনুর আরও বলেন, স্কুলে থাকাকালে হঠাৎ মাসিক শুরু হলে প্রয়োজনীয় উপকরণ না থাকার ভয় সবসময় কাজ করত। একই সঙ্গে তিনি বড় হয়েছেন এমন ধারণা শুনে যে, মাসিকের সময় গোসল করলে অসুস্থ হওয়া বা ওজন বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং মাসিক ‘অপবিত্রতার’ লক্ষণ।
পাকিস্তানের ১৯৯০ সালের বিক্রয় কর আইন অনুসারে, মাসিক পণ্যকে অন্য যেকোনো ভোগ্যপণ্যের মতো গণ্য করা হতো, এবং আমদানিকৃত পণ্যের উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতো। এই করগুলো একত্রে পণ্যের দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছিল, যার ফলে বেশিরভাগ মেয়ে ও নারীর জন্য মৌলিক স্যানিটারি পণ্য ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
বিশ্ব ব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ নারী হলেও মাত্র ১২ শতাংশ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করেন, যার প্রধান কারণ উচ্চমূল্য। এছাড়া মাত্র ২৭ শতাংশ নারী মাসিককে স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবে বোঝেন।
পাকিস্তানে মাসিক-সংক্রান্ত পণ্যের ওপর দীর্ঘদিনের বিক্রয়কর বা ‘পিরিয়ড ট্যাক্স’ বাতিল হলেও, কর্মীরা বলছেন এটি কেবল একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। মাসিক নিয়ে সামাজিক ট্যাবু, সচেতনতার অভাব এবং স্যানিটারি পণ্যের উচ্চমূল্য এখনও লাখো নারীর জন্য বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
প্রচারকদের মতে, ধারাবাহিক সরকারগুলোর উদাসীনতা এবং নীরবতার সংস্কৃতির কারণেই মাসিক-সংক্রান্ত বিষয়গুলো দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থেকেছে।
তাদের অনলাইন প্রচারণায় হাজারো মানুষ সমর্থন জানান। শুরুতে পাকিস্তানের ফেডারেল বোর্ড অফ রেভিনিউ করকে বৈধ ও বৈষম্যহীন বলে দাবি করলেও, পরে সরকার অবস্থান পরিবর্তন করে কর প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
মাহনুর ওমর বলেন, পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদে এত খোলামেলাভাবে মাসিক নিয়ে আগে কখনও আলোচনা হয়নি। নারীদের নানা সমস্যা সংসদে এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অনেক পুরুষ আইনপ্রণেতার এ বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই, আবার প্রভাবশালী অনেক নারীও প্রান্তিক নারীদের বাস্তবতা থেকে দূরে অবস্থান করেন।
তবে অধিকারকর্মীদের মতে, কর প্রত্যাহারের ফলে স্যানিটারি পণ্যের দাম কমলেও পাকিস্তানে মাসিক নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবার মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ এখনও প্রয়োজন।