সিন্ধু নদের পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধে পাকিস্তানের পক্ষে বড় ধরনের আইনি জয় এসেছে। নেদারল্যান্ডসের হেগে স্থায়ী সালিশি আদালত (পিসিএ) রায় দিয়েছে, ভারত একতরফাভাবে সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত রাখতে পারে না। ছয় দশকের পুরোনো এই চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে এবং ভারতকে এর অধীনে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে সর্বসম্মতভাবে জানিয়েছে আদালত।
সোমবার দেওয়া পাঁচ সদস্যের আদালতের রায়ে বলা হয়, ভারত চুক্তির আওতায় পাকিস্তানে প্রবাহিত নদীগুলোর ওপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা ও পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য। ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারত প্রথমবারের মতো একতরফাভাবে ‘স্থগিত’ ঘোষণা করার বৈধতা নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক আদালত রায় দিল।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার পর ভারত চুক্তিটি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। নয়াদিল্লির দাবি ছিল, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের সমর্থন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত থাকবে। ওই হামলায় ২৬ জন নিহত হন। পাকিস্তান হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ভারত শুরু থেকেই এই মামলায় হেগের স্থায়ী সালিশি আদালতের এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করে আসছে। মামলার শুনানিতেও ভারত অংশ নেয়নি। ২০২৬ সালের ২৬ থেকে ২৮ এপ্রিল হেগের পিস প্যালেসে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শুধু পাকিস্তানের প্রতিনিধিরাই অংশ নেন। আদালত ভারতের উত্থাপিত সার্বভৌমত্ব, চুক্তি পুনর্বিবেচনায় পাকিস্তানের অনীহা, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রয়োজনীয়তার মতো যুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে।
রায়ের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এটিকে পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারতকে চুক্তির বাধ্যবাধকতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে।
তবে ভারত দ্রুতই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আদালতকে ‘অবৈধভাবে গঠিত’ বলে উল্লেখ করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, পাকিস্তান সীমান্তপারের হামলায় সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। পাকিস্তান অবশ্য এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রায়টি পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে। তবে আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আদেশের মতো সরাসরি কোনো প্রয়োগকারী ব্যবস্থা নেই। ফলে ভারত রায় মানতে অস্বীকৃতি জানালে পাকিস্তানের হাতে মূলত আন্তর্জাতিক ফোরামে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথই বেশি কার্যকর থাকবে।
সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তির বাস্তব কার্যক্রমও কয়েক বছর ধরে স্থবির। পাকিস্তানের দাবি, ভারত ২০২৩ সাল থেকে নিয়মিত নদীর পানিপ্রবাহের তথ্য দেওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শনের সুযোগ বন্ধ রেখেছে। দুই দেশের যৌথ প্রতিষ্ঠান পার্মানেন্ট ইন্ডাস কমিশনের বৈঠকও ২০২২ সালের মে মাসের পর আর হয়নি। পাকিস্তান চুক্তির আওতায় কমিশনের বৈঠক, পরিদর্শন ও তথ্য আদান-প্রদান পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে।
পানি নিয়ে বিরোধটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এটিকে দেশের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও বলেছেন, পাকিস্তানের পানির প্রতিটি ফোঁটা তাদের ‘রেড লাইন’। পানি বা সার্বভৌমত্বের ওপর ভারত কোনো পদক্ষেপ নিলে ২০২৫ সালের মে মাসের সংঘাতের চেয়েও শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
তবে পাকিস্তানের পানি বিশেষজ্ঞ হাসান আব্বাস মনে করেন, বর্তমানে সিন্ধু চুক্তির অচলাবস্থা পাকিস্তানের জন্য তাৎক্ষণিক অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করেনি। তার মতে, পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি প্রবাহ মূলত ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে সুরক্ষিত। ভারতের এসব নদীতে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর পানি সংরক্ষণ ক্ষমতাও সীমিত। ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য নদীর পানি পুরোপুরি আটকে রাখা ভারতের পক্ষেও কঠিন।
হেগের রায় তাই পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও কূটনৈতিক অর্জন হলেও এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করছে ভারত কতটা রায় মেনে চলে এবং দুই দেশ ভবিষ্যতে সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তির আওতায় আবারও আলোচনায় ফিরতে পারে কি না—তার ওপর।