পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের চিকিৎসা নিয়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া বিশেষ নির্দেশকে কেন্দ্র করে আইনের দৃষ্টিতে সমতার প্রশ্ন উঠেছে। তাকে কারাগার থেকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া, পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের সুযোগ এবং চিকিৎসায় বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।
১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ ইমরান খানকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন এবং সপ্তাহে পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী শুনানি ১৬ সেপ্টেম্বর হওয়ার কথা রয়েছে।
ইমরানের পরিবার ও তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দাবি করছে, কারা কর্তৃপক্ষ আদালতের নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করছে না। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার ওই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেছে।
তবে বিতর্কের মূল বিষয় ইমরানকে চিকিৎসা দেওয়া হবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো—দেশটির অন্য বন্দিরা একই ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়লে তারা কি একই সুবিধা পাবেন?
পাকিস্তানের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতার কথা বলা হয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইমরান খান অবশ্যই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যদি অন্য বন্দিদের তুলনায় বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে তা আইনের সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
গুরুতর অসুস্থতার প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্ট ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সময় তার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নথি আদালতের হাতে ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১ আগস্ট পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের (পিআইএমএস) এক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইমরানের রক্তচাপ ১৪০/১০০ পান। তাকে রক্তচাপ কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। ১০ আগস্ট চার সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড তার রক্তচাপ ১৪০/৮০ পায় এবং প্রতিদিন এক ঘণ্টা হাঁটার পরামর্শ দেয়।
তবে এসব তথ্য গুরুতর চিকিৎসা জরুরি অবস্থার স্পষ্ট প্রমাণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর কয়েক দিন পর ২১ আগস্ট ইমরানের বোন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. উজমা খান সংবাদ সম্মেলনে তার ভাইকে ‘১০০ শতাংশ ফিট’ বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি ইমরানকে মানসিক নির্যাতন, একাকী রাখা ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগ করেন।
ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে এর আগেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তার পরিবার দাবি করেছিল, ডান চোখের দৃষ্টিশক্তির বড় একটি অংশ তিনি হারিয়েছেন। সরকার অবশ্য এ দাবি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। পরে তার চোখের অবস্থার উন্নতির কথা জানানো হয়।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, ২০২৩ সালে কারাবন্দি হওয়ার পর ইমরানের প্রায় ৩০ বার বিভিন্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়েছে।
অন্য বন্দিরা কি একই সুবিধা পাবেন?
ইমরান খানের চিকিৎসা নিয়ে চলমান বিতর্কে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—একই ধরনের অসুস্থতার কথা জানিয়ে অন্য কোনো বন্দি আদালতের দ্বারস্থ হলে তাকেও কি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা, ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং পরিবারের সদস্যদের বিশেষ সহায়তা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, বন্দিদের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। তবে কোন হাসপাতালে চিকিৎসা হবে, কত দিন হাসপাতালে রাখা হবে এবং কখন তাকে কারাগারে ফেরানো হবে—এসব বিষয়ে চিকিৎসকদের পেশাগত মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ইমরান খানের ঘটনা পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থার সামনে তাই একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—আইনের চোখে সব বন্দি কি সমান, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে কেউ বিশেষ সুবিধা পাবেন?
সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর