অর্থনৈতিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক অসন্তোষে সংকটে রয়েছে পাকিস্তান। দেশটির কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই সংকটের গভীরতা প্রকাশ পেয়েছে। তাদের বক্তব্যের মূল সুর—পাকিস্তানের সমস্যা শুধু কে দেশ চালাবে তা নয়, বরং রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সম্প্রতি ভারত ও পাকিস্তানের গতিপথের তুলনা করে দেশের পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। দুই দেশ প্রায় একই সময়ে স্বাধীন হলেও অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, শিল্প ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে ভারত অনেক এগিয়ে গেছে। বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেছেন আসিফ।
ভারতের সঙ্গে এই তুলনা মূলত পাকিস্তানের নিজস্ব উন্নয়ন ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি। নিরাপত্তা ও ভারতবিরোধী অবস্থানকে দীর্ঘদিন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখলেও তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কার্যকর শাসন নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে দেশটির নেতৃত্বের মধ্যেই এখন প্রচলিত নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভিও দেশটির প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন। জুলাইয়ে পাকিস্তান ইকোনমিক সামিটে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যে ব্যবস্থার মধ্যে দেশ পরিচালিত হচ্ছে, সেটি কার্যত ভেঙে পড়েছে। তিনি নতুন প্রদেশ বা প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
নাকভির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রতিদিন ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করলেও সরকারের বড় অংশের সময় সংকট মোকাবিলায় ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ, সমস্যা ব্যক্তির কর্মদক্ষতার চেয়ে বড়—প্রশাসনিক কাঠামো ও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতেই গভীর দুর্বলতা রয়েছে। তবে তিনি পরে স্পষ্ট করেন, তার মন্তব্য শাহবাজ শরিফ সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান নয়।
অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান আরও সরাসরি সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তিনি সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে রাজনীতিতে অংশ নিতে চাইলে ইউনিফর্ম খুলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূল কথা, সামরিক ক্ষমতা রাজনৈতিক বৈধতার বিকল্প হতে পারে না।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জঙ্গি তৎপরতা এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক জন-অসন্তোষ সরকারের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। অর্থাৎ, সংকট শুধু ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই; দেশের ভেতরেও নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে।
অর্থনীতিতেও স্বস্তি নেই। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, ঋণের চাপ ও সীমিত উন্নয়ন ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছে। বৈদেশিক সহায়তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উদ্যোগ কিছুটা স্বস্তি আনলেও তা এখনো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি।
তবে এসব সংকটের অর্থ এই নয় যে শাহবাজ শরিফ সরকার অবিলম্বে পতনের মুখে। পাকিস্তানে বেসামরিক সরকারের টিকে থাকা শুধু সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে না; সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সামরিক নেতৃত্ব বর্তমান ব্যবস্থাকে বড় ধরনের বোঝা মনে না করলে সরকার হঠাৎ পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা জনসমর্থন কমাতে পারে, আঞ্চলিক অসন্তোষ রাষ্ট্রের বৈধতা দুর্বল করতে পারে এবং জঙ্গি তৎপরতা প্রশাসনিক ব্যর্থতা প্রকাশ করতে পারে। রাজনৈতিক বিভাজনও প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মূল বক্তব্য হলো, পাকিস্তানের সংকটের সমাধান শুধু সরকার পরিবর্তন, নতুন প্রদেশ সৃষ্টি কিংবা সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে হবে না। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক বৈধতা, কার্যকর প্রশাসন ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। সামরিক শক্তি নিরাপত্তা দিতে পারে, কিন্তু তা রাজনৈতিক বৈধতা বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিকল্প হতে পারে না।