রাশিয়ার যুদ্ধ ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরোধিতা করে দেশ ছেড়ে পালানো রুশ নাগরিকরা এখন রাশিয়া ও ইউরোপ—দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়ছেন। মস্কো তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশও আশ্রয় ও বসবাসের সুযোগ কঠিন করে তুলছে।
চলতি মাসের শুরুতে পুতিন বিদেশে থাকা সরকারবিরোধী রুশ নাগরিকদের বিরুদ্ধে নতুন আইন করেছেন। রাজনৈতিক মামলায় অনুপস্থিতিতে দণ্ডিত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট নবায়নসহ বিভিন্ন কনস্যুলার সেবা সীমিত করা হয়েছে। ‘বিদেশি এজেন্ট’ আইন লঙ্ঘন কিংবা রুশ সেনাবাহিনীকে ‘অসম্মান’ করার মতো অভিযোগেও এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
রাশিয়ায় ২০২৩ সালের নতুন নাগরিকত্ব আইনের পর থেকে ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে বিদেশে থাকা বিরোধীদের এমন অবস্থায় ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যেখানে কাগজে তারা রুশ নাগরিক থাকলেও বাস্তবে পাসপোর্ট ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন।
ইউরোপেও কঠিন হচ্ছে আশ্রয়
রুশ বিরোধীদের জন্য ইউরোপেও পরিস্থিতি সহজ নেই। জার্মানিতে মানবিক ভিসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে। দেশটি রুশ সেনাবাহিনী থেকে পালানো কিছু ব্যক্তিকে তৃতীয় দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিনল্যান্ডে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এক হাজারের বেশি রুশ নাগরিককে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এক হাজার ১০০-এর বেশি আশ্রয় আবেদন নাকচ হয়েছে। বাল্টিক দেশগুলোতেও রুশ নাগরিকদের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও রুশ আশ্রয়প্রার্থীদের পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে আশ্রয় আবেদন কার্যক্রম অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রয়েছে এবং শত শত রুশ আশ্রয়প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশও মস্কোর অনুরোধে রুশ নাগরিকদের ফেরত পাঠাচ্ছে।
যুদ্ধবিরোধীরাই বেশি বিপদে
রুশ-আর্মেনীয় জলবায়ু আন্দোলনকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরশাক মাকিচিয়ান নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। যুদ্ধের প্রতিবাদ করায় তিনি রাশিয়া ছাড়তে বাধ্য হন এবং পরে রুশ নাগরিকত্ব হারান। জার্মানিতে অবস্থানকালে তিনি কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিলেন। পরে আর্মেনিয়ার নাগরিকত্ব পান।
তার মতে, রুশ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানুষদের শুধু রুশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই নয়, বিদেশেও নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। ফলে পুতিনের যুদ্ধের বিরোধিতা করে দেশ ছাড়ার পরও তারা নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছেন না।
নতুন করে রাশিয়ায় সেনা সমাবেশের আশঙ্কা দেখা দিলে আরও অনেক মানুষ দেশ ছাড়ার কথা ভাবতে পারেন। বিশেষ করে যেসব রুশ নাগরিক যুদ্ধে অংশ নিতে চান না, তাদের জন্য বিদেশে নিরাপদ ও নিশ্চিত আশ্রয়ের পথ এখনো নেই।
লেখকের মতে, রাশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগের কারণ থাকলেও শুধু রুশ নাগরিকত্বকে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিচয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। পুতিন সরকারের বিরোধিতা করে যারা দেশ ছেড়েছেন, তাদের শাস্তি না দিয়ে মানবিক ও আইনগত সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।