হোম > বিশ্ব > রাশিয়া

ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিন কী পাচ্ছেন, রাশিয়া কী হারাচ্ছে

আনিসুর রহমান এরশাদ

ছবি: সংগৃহীত।

ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য একই সঙ্গে অর্জন ও ক্ষতির এক জটিল সমীকরণ। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর সময় মস্কোর প্রত্যাশা ছিল দ্রুত সামরিক সাফল্য অর্জন, কিয়েভের ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং ইউক্রেনকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বলয়ের বাইরে রাখা। কিন্তু যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়নি। বরং চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থাকে নতুন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

পুতিন কিছু ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছেন, সামরিক উৎপাদন বাড়িয়েছেন এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। অন্যদিকে, বিপুল সেনা হতাহত, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, ন্যাটোর সম্প্রসারণ এবং চীনের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে জটিল করেছে।

২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে যুদ্ধের সামরিক পরিস্থিতিও মস্কোর জন্য একমুখী সাফল্যের ছবি দিচ্ছে না। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের ১ নভেম্বরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, রুশ বাহিনী অক্টোবর মাসে ইউক্রেনে যতটা ভূখণ্ড দখল করেছে, তার চেয়ে বেশি ভূখণ্ড হারিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, পুতিন এই যুদ্ধ থেকে বাস্তবে কী অর্জন করছেন এবং এর বিনিময়ে রাশিয়াকে কী মূল্য দিতে হচ্ছে?

পুতিন যা পাচ্ছেন

১. ইউক্রেনের ভূখণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশের নিয়ন্ত্রণ

যুদ্ধের সবচেয়ে দৃশ্যমান অর্জন রাশিয়ার হাতে ইউক্রেনের কিছু ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ। ক্রিমিয়া ছাড়াও দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অংশ রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব ভূখণ্ডকে রাশিয়া নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে, যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৃহত্তর অংশ এই সংযুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষণা অনুযায়ী, রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে ২০২২ সালের আগেই দখলে থাকা ক্রিমিয়া ও দনবাসের অংশও রয়েছে। পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর নতুন করে দখল করা ভূখণ্ড ইউক্রেনের মোট আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ।

এই নিয়ন্ত্রণ রাশিয়াকে আজভ সাগরকেন্দ্রিক অবস্থান, ক্রিমিয়ার সঙ্গে স্থলপথের যোগাযোগ এবং ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও শিল্পাঞ্চলের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে। তবে সামরিক নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ী রাজনৈতিক বা আইনগত মালিকানা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

২. ক্রিমিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্থলপথ

২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর থেকেই উপদ্বীপটি রাশিয়ার সামরিক ও ভূরাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্র। ২০২২ সালের যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়া ক্রিমিয়ার সঙ্গে দনবাস এবং দক্ষিণ ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলগুলোর স্থলপথে সংযোগ তৈরি করেছে। এতে কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগর অঞ্চলে রাশিয়ার সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।

ক্রিমিয়া রুশ নৌবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি এবং দক্ষিণ ইউক্রেনের সামরিক অভিযানের রসদ সরবরাহের কেন্দ্র। তবে ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহর এবং ক্রিমিয়ার সামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থাৎ ভৌগোলিক সুবিধা অর্জিত হলেও সেই সুবিধা নিরাপদ রাখা ক্রমেই ব্যয়বহুল হচ্ছে।

৩. সামরিক শিল্প ও যুদ্ধকালীন উৎপাদন বৃদ্ধি

যুদ্ধ রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ দিয়েছে। গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সাঁজোয়া যান এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রুশ সামরিক বাহিনীকে ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধকৌশলের ক্ষেত্রে নতুন অভিজ্ঞতাও দিয়েছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) ২০২৬ সালের মার্চের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়ার যুদ্ধ ও অন্যান্য সামরিক খাতে সরকারি বরাদ্দ প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন রুবলে পৌঁছেছিল, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি রাশিয়ার অর্থনীতিতে সামরিক উৎপাদনের ব্যাপকতা বোঝায়।

তবে সামরিক উৎপাদন বৃদ্ধি মানেই সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়। বেসামরিক শিল্প, শ্রমবাজার ও ভোক্তা অর্থনীতির ওপর এর চাপও বাড়ছে।

৪. পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অর্থনীতি সচল রাখা

পশ্চিমা দেশগুলোর নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞার পরও রাশিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি। জ্বালানি রপ্তানি, এশিয়ার বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিকল্প আর্থিক লেনদেন এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে মস্কো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

বিশেষ করে চীন, ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য রাশিয়াকে ইউরোপের বাজার হারানোর আংশিক ক্ষতি সামাল দিতে সাহায্য করেছে। ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। তবে বিকল্প বাজারের ওপর নির্ভরতা এবং প্রযুক্তি আমদানির সীমাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদে নতুন দুর্বলতা তৈরি করছে।

৫. অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুদ্ধকে ক্ষমতা সংহত করার উপাদান হিসেবে ব্যবহার

পুতিন যুদ্ধকে রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা ও পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বয়ানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে যুদ্ধকে অনেক সময় রাশিয়ার অস্তিত্ব ও ঐতিহাসিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

যুদ্ধের বিরোধী বক্তব্য ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে বিকল্প রাজনৈতিক বয়ানের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও জাতীয় ঐক্যের যুক্তিতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কর্তৃত্ব আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

যুদ্ধ পুতিনের ক্ষমতা সংহত করার উপাদান হয়েছে, কিন্তু সেটি রুশ জনগণের সর্বজনীন সমর্থনের প্রমাণ নয়। জনমত পরিমাপের ক্ষেত্রে স্বাধীন জরিপ, রাষ্ট্রীয় প্রচার এবং ভয়ের পরিবেশের প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাশিয়া যা হারাচ্ছে

৬. বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সম্পদের ক্ষয়

যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীকে। দীর্ঘস্থায়ী সম্মুখযুদ্ধ, কামান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং ইউক্রেনের প্রতিরোধে বিপুলসংখ্যক রুশ সেনা নিহত ও আহত হয়েছেন।

সিএসআইএসের ১ জুলাই ২০২৬-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত রুশ বাহিনীর নিহত, আহত ও নিখোঁজ সদস্যের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ। এর মধ্যে নিহতের সংখ্যা ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখ হতে পারে বলে গবেষণাটিতে অনুমান করা হয়েছে। এগুলো স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব।

একই গবেষণা বলছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে রাশিয়ার মাসিক সামরিক হতাহতের সংখ্যা নতুন নিয়োগের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে সামরিক বাহিনীর জনবল পূরণ, প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

৭. ন্যাটোকে দুর্বল করার পরিবর্তে সম্প্রসারণের সুযোগ করে দেওয়া

পুতিনের অন্যতম ঘোষিত নিরাপত্তা উদ্বেগ ছিল ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ। ইউক্রেনের ন্যাটোঘনিষ্ঠতা রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি—এমন যুক্তি তুলে ধরেই মস্কো যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

কিন্তু যুদ্ধের পরিণামে ন্যাটো আরো সম্প্রসারিত হয়েছে। ফিনল্যান্ড ২০২৩ সালের এপ্রিলে এবং সুইডেন ২০২৪ সালের মার্চে ন্যাটোর সদস্য হয়েছে। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর স্থলসীমান্ত উল্লেখযোগ্যভাবে দীর্ঘ হয়েছে।

কার্নেগি এনডাওমেন্টের ২০২৬ সালের মার্চের গবেষণায় বলা হয়েছে, যুদ্ধ রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তকে আরও কৌশলগতভাবে জটিল করেছে। অর্থাৎ ইউক্রেনকে ন্যাটোর বাইরে রাখার যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার বিপরীতে ইউরোপের উত্তরাঞ্চলে ন্যাটোর উপস্থিতি বেড়েছে।

৮. ইউরোপের জ্বালানি বাজার ও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক হারানো

যুদ্ধের আগে ইউরোপ ছিল রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম প্রধান বাজার। এই বাজার রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল।

কিন্তু যুদ্ধের পর ইউরোপ রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেয়। বিকল্প সরবরাহকারী, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং নতুন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়।

জার্মান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ২০২৫ সালের জুলাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ ইউরোপ ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্কের কাঠামো মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। ইউরোপের বাজার হারিয়ে রাশিয়াকে নতুন ক্রেতা ও পরিবহনপথের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। এটি শুধু বাণিজ্যিক ক্ষতি নয়; ইউরোপের ওপর রাশিয়ার দীর্ঘদিনের জ্বালানি কূটনীতির প্রভাবও কমিয়েছে।

৯. চীনের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে চীন রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক অংশীদার হয়ে উঠেছে। চীনের বাজারে রুশ জ্বালানি রপ্তানি, চীনা পণ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিকল্প আর্থিক লেনদেন রাশিয়ার যুদ্ধকালীন অর্থনীতিকে সহায়তা করছে।

কিন্তু এই সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে সমান ক্ষমতার অংশীদারত্ব নয়। রাশিয়ার বিকল্প বাজার ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্রয়োজন যত বাড়ছে, চীনের দর-কষাকষির ক্ষমতাও তত বাড়ছে। ফলে মস্কোকে অনেক ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হচ্ছে।

জার্মান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার চীনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলেও মস্কোর প্রভাব তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়েছে।

১০. রাশিয়ার আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও কৌশলগত প্রভাবের ক্ষয়

পুতিনের লক্ষ্য ছিল রাশিয়াকে আবার বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে একটি প্রধান সিদ্ধান্তগ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে বৈরী হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পূর্ব ইউরোপ, ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার একচ্ছত্র প্রভাবও আগের মতো নেই।

২০২৪ সালে সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্য নীতির জন্য বড় ধাক্কা ছিল। অন্যদিকে, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান ও কাজাখস্তানের মতো দেশগুলো নিজেদের কূটনৈতিক বিকল্প বাড়িয়েছে।

জার্মান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে মনোযোগ ও সম্পদ ব্যয় করতে গিয়ে রাশিয়া তার সাবেক প্রভাববলয়ের অন্যান্য অঞ্চলে আগের মতো নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারছে না।

যুদ্ধের বর্তমান সামরিক পরিস্থিতি: কে এগিয়ে?

২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র রাশিয়ার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের ১ নভেম্বর ২০২৬-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, অক্টোবর মাসে রুশ বাহিনী প্রায় ১৩৯ দশমিক ৮৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনলেও প্রায় ১৬৭ দশমিক ১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা হারিয়েছে। অর্থাৎ মাসটিতে তাদের নিট ভূখণ্ডগত ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, রুশ বাহিনী ওই মাসে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ মাসিক হতাহতের মুখেও পড়েছে। তবে হতাহতের এই হিসাব ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে, সিএসআইএসের ২০২৬ সালের জুলাইয়ের গবেষণা বলছে, রাশিয়ার অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর দৈনিক অগ্রগতির গড় মাত্র ৫০ থেকে ৯০ মিটার। এত বিপুল জনবল ও সামরিক সরঞ্জাম ব্যয়ের পরও সীমিত ভূখণ্ডগত সাফল্য রাশিয়ার যুদ্ধকৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

অবশ্য ইউক্রেনও ভয়াবহ মানবিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতির শিকার। দেশটির বহু শহর ধ্বংস হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চাপ সামলাতে হচ্ছে। পশ্চিমা সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকলেও ইউক্রেনের জনবল ও অস্ত্র সরবরাহের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

পুতিনের সবচেয়ে বড় হিসাবের অমীমাংসিত প্রশ্ন

এই যুদ্ধের ফলাফল শুধু কত বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড কার নিয়ন্ত্রণে থাকল, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, যুদ্ধ শেষে ইউক্রেন কতটা স্বাধীন ও সামরিকভাবে সক্ষম থাকবে, রাশিয়া কতটা ভূখণ্ড ধরে রাখতে পারবে, ন্যাটোর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং রুশ অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয় সামলে কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

পুতিন হয়তো কিছু ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিজয়ের দাবি করতে পারবেন। কিন্তু ইউক্রেনকে সম্পূর্ণভাবে রাশিয়ার প্রভাববলয়ে ফিরিয়ে আনা, ন্যাটোর সম্প্রসারণ ঠেকানো এবং ইউরোপে রাশিয়ার আগের কৌশলগত অবস্থান ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যগুলো এখনো অর্জিত হয়নি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রাশিয়ার সামরিক শিল্প ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও বেসামরিক অর্থনীতি, জনসংখ্যা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং মানবসম্পদের ওপর চাপ বাড়তে পারে। সামরিক ব্যয় দিয়ে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রদর্শন করা যায়, কিন্তু তা দিয়ে সব ধরনের জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করা যায় না।

ভূখণ্ডের অর্জন, কৌশলগত ক্ষতির মূল্য

ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের অর্জন বাস্তব, কিন্তু তার মূল্যও অত্যন্ত বেশি। তিনি ইউক্রেনের উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন, সামরিক উৎপাদন বাড়িয়েছেন এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রেখেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে রাশিয়া বিপুল সামরিক জনবল হারিয়েছে, ন্যাটোর সম্প্রসারণ প্রত্যক্ষ করেছে, ইউরোপের জ্বালানি বাজারের বড় অংশ হারিয়েছে এবং চীনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে।

সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব হলো, পুতিন ইউক্রেনকে রাশিয়ার নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন; কিন্তু যুদ্ধের ফলে ইউক্রেন আরো বেশি পশ্চিমমুখী হয়েছে এবং ইউরোপের নিরাপত্তাব্যবস্থা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরো সংগঠিত হয়েছে।

অতএব, পুতিন কিছু ভূখণ্ড পেতে পারেন, কিন্তু সেই ভূখণ্ড ধরে রাখার বিনিময়ে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেটিই এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মস্কোর কঠিন জীবনে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের উষ্ণতা

রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে নিহত ২৬

যুদ্ধের প্রস্তুতি এস্তোনিয়ার, রুশ সীমান্তে ১৫০ বাংকার নির্মাণের পরিকল্পনা

ইউরোপের নেতারা রাজনৈতিক আত্মনিপীড়ক: লাভরভ

রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর

রাশিয়াকে কখনোই হারাতে পারবে না ইউরোপ

ইউক্রেন যুদ্ধে ‘স্টারশিল্ড’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ইউক্রেনের ১২৬টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি রাশিয়ার

‘রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক মুহূর্ত’

শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল রাশিয়া