দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থাকা কাস্পিয়ান সাগর এখন ইরান ও রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাণিজ্যপথে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই জলপথ ব্যবহার করে সামরিক সরঞ্জাম থেকে খাদ্যপণ্য সবকিছুর আদান-প্রদান দ্রুত বাড়ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র জানিয়েছে।
সম্প্রতি ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের বন্দর শহর বান্দার আনজালির নৌ-কমান্ড সেন্টার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর কাস্পিয়ান সাগরের কৌশলগত গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে। ইসরায়েল দাবি করেছে, ওই হামলায় ইরানের কয়েকটি নৌযানও ধ্বংস করা হয়েছে এবং এটিকে তারা ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের একটি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগরের বিকল্প হিসেবে কাস্পিয়ান এখন রাশিয়া ও ইরানের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ এবং নজরদারিহীন একটি বাণিজ্যপথ। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়া এই পথ ব্যবহার করে ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ পাঠাচ্ছে, যাতে সাম্প্রতিক সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের ড্রোন সক্ষমতা দ্রুত পুনর্গঠন করা যায়।
একই সঙ্গে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতেও কাস্পিয়ান রুটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেশটির খাদ্যশিল্প সমিতির প্রধান মোহাম্মদ রেজা মোরতাজাভি জানিয়েছেন, গম, ভুট্টা, পশুখাদ্য, সূর্যমুখী তেলসহ জরুরি খাদ্যপণ্য এখন দ্রুত কাস্পিয়ান বন্দরগুলো দিয়ে আমদানি করা হচ্ছে। ইরানের চারটি কাস্পিয়ান বন্দর দিনরাত কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
রাশিয়ার বন্দর-পরিসংখ্যান এবং বাণিজ্য বিশ্লেষকরাও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কাস্পিয়ান রুটে পণ্য পরিবহন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন। আগে কৃষ্ণসাগর হয়ে ইরানে যাওয়া প্রায় ২০ লাখ টন রুশ গম এখন কাস্পিয়ান হয়ে পাঠানো হচ্ছে। ইউক্রেনীয় হামলার ঝুঁকির কারণে কৃষ্ণসাগর রুট অনিরাপদ হয়ে পড়ায় এই পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাস্পিয়ান সাগরের বড় সুবিধা হলো এটি স্থলবেষ্টিত এবং এর জলসীমায় প্রবেশাধিকার কেবল পাঁচটি উপকূলীয় দেশের। ফলে যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা নৌবাহিনীর সরাসরি নজরদারি বা জাহাজ আটকানোর সুযোগ সীমিত। এ ছাড়া অনেক জাহাজ ট্র্যাকিং সিগন্যাল বন্ধ রেখে চলাচল করায় এই রুটের বাণিজ্য কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ফ্রান্সের সায়েন্সেস পো-র গবেষক নিকোল গ্রায়েভস্কির ভাষায়, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য আদর্শ জায়গা হলো কাস্পিয়ান।
রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতাও এই রুটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অতীতে ইরান রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছিল। পরে রাশিয়া নিজস্ব কারখানায় সেই প্রযুক্তিতে ড্রোন উৎপাদন শুরু করে। এখন দুই দেশ প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম বিনিময় অব্যাহত রেখেছে বলে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান একটি বিস্তৃত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে কাস্পিয়ানকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ নয়। রাশিয়া ও ইরান প্রায় দুই দশক ধরে বাল্টিক সাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাণিজ্য করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই প্রকল্প এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের জন্য কাস্পিয়ান এখন একটি ভূরাজনৈতিক অন্ধকার অঞ্চল হয়ে উঠছে। কারণ, এই জলপথ দিয়ে রাশিয়া ও ইরান কী ধরনের সামরিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন চালাচ্ছে, তার পূর্ণ চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস
এআরবি