হোম > বিশ্ব > তুরস্ক

বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির পথে তুরস্ক, মক্কা চুক্তি থেকে এসসিও-ন্যাটো

আমার দেশ অনলাইন

পশ্চিমা সামরিক জোটে থেকেও সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং চীন-রাশিয়াকেন্দ্রিক সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-তে ঘনিষ্ঠতার উদ্যোগ—এরদোয়ান কি তুরস্ককে নতুন ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের কেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছেন? তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বহুমাত্রিক কূটনীতি তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির একটি ক্রমবর্ধমান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশটি একদিকে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে আছে, অন্যদিকে চীন, রাশিয়া, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করছে। ফলে আঙ্কারার কূটনীতিকে এখন আর কেবল পশ্চিমা জোটের অংশ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। বরং তুরস্ক একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই চুক্তিতে সই করে। চুক্তির মূল ধারণা হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশের কর্মকর্তারা চুক্তির অধীনে গঠিত কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জোটটির নাম ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে।

এই চুক্তিকে অনেকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে তুলনাটি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তব কাঠামোর দিক থেকে মক্কা চুক্তি এখনো ন্যাটোর সমতুল্য কোনো সামরিক জোট নয়। এর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবে কার্যকর হবে, কোন পরিস্থিতিতে সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে এবং যৌথ কমান্ড বা সামরিক সক্ষমতা কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

তবে চুক্তিটির কৌশলগত গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পদ, তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক সক্ষমতা, আর পাকিস্তানের রয়েছে বড় সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতা। ফলে তিন দেশের সক্ষমতা পরস্পরকে সম্পূরক করার সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন করে ভাবার প্রবণতাও এই চুক্তির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।

মজার বিষয় হলো, এই নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো তুরস্ককে ন্যাটো থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে—এমন দাবি আঙ্কারা প্রত্যাখ্যান করেছে। তুরস্কের যোগাযোগ অধিদপ্তর স্পষ্ট করে বলেছে, মক্কা চুক্তি ন্যাটোর বিকল্প নয়; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি পরিপূরক ব্যবস্থা। তুরস্কের ভাষায়, আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার অর্থ ন্যাটো সদস্যপদ থেকে সরে যাওয়া নয়।

এখানেই তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্যটি ধরা পড়ে। আঙ্কারা কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হতে চাইছে না। ন্যাটো তার জন্য সামরিক ও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও একই সময়ে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং এশিয়ার বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। এই নীতিকে ‘বহুমুখী কূটনীতি’ বা ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তুরস্ক বর্তমানে এসসিওর পূর্ণ সদস্য নয়; তার অবস্থান ডায়ালগ পার্টনারের। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শুরুতে এসসিও সম্মেলন থেকে ফেরার পথে প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান জানান, তুরস্ক সংস্থাটির পূর্ণ সদস্য হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তিনি একই সঙ্গে জোর দিয়ে বলেন, পূর্বের শক্তিগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মানে পশ্চিমা জোট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়।

এসসিওর গুরুত্ব এখানেই যে এর কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন ও রাশিয়া। ভারত, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশও এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে তুরস্ক যদি ভবিষ্যতে পূর্ণ সদস্যপদের দিকে এগোয়, তাহলে সেটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগ দেওয়ার ঘটনা হবে না; এর মাধ্যমে আঙ্কারা একই সঙ্গে পশ্চিমা ও অ-পশ্চিমা নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক করতে পারবে।

তবে এই নীতির ঝুঁকিও রয়েছে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে তুরস্কের ওপর পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদিকে এসসিওর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হলে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে আঙ্কারার কৌশলগত সহযোগিতা আরো বাড়তে পারে। ফলে দুই ভিন্ন ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা তুরস্কের জন্য ক্রমেই জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তবে এরদোয়ান সরকারের দৃষ্টিতে এই দ্বৈততা হয়তো সমস্যার চেয়ে সুযোগই বেশি। তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, কৃষ্ণসাগর, ককেশাস, মধ্য এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই ভূগোলকে কাজে লাগিয়ে আঙ্কারা নিজেকে কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

মক্কা চুক্তি সেই নীতির মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক প্রকাশ। এসসিওর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ তার এশিয়ামুখী প্রকাশ। আর ন্যাটো সদস্যপদ তার পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখার নিশ্চয়তা। তিনটি বিষয়কে পাশাপাশি রাখলে তুরস্কের কৌশলটি অনেকটা পরিষ্কার হয়—কোনো একটি জোট বেছে নেওয়ার পরিবর্তে একাধিক কাঠামোর মধ্যে নিজের প্রভাব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো।

এই নীতি সফল হলে তুরস্ক ভবিষ্যতের বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তি হিসেবে আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। পশ্চিম ও পূর্বের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে আঙ্কারা উভয় পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখার সুবিধা পাবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা কিংবা এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক করিডর—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুরস্ক মধ্যস্থতাকারী বা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজের ভূমিকা বাড়াতে পারে।

কিন্তু বহুমুখী কূটনীতি সফল করতে হলে ভারসাম্য রক্ষাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। একই সময়ে ন্যাটো, এসসিও, সৌদি আরব, পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার অর্থ হলো পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মধ্যেও নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ধরে রাখা। কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা অন্য পক্ষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তাই মক্কা চুক্তি কিংবা এসসিওর দিকে তুরস্কের অগ্রসর হওয়াকে ন্যাটো ত্যাগের প্রস্তুতি হিসেবে দেখার চেয়ে একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা সম্ভব। আঙ্কারা হয়তো বুঝতে পেরেছে, ভবিষ্যতের বিশ্ব আর একক কোনো শক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হবে না। চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, ততই বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার মূল্য বাড়বে।

তুরস্কের জন্য তাই প্রশ্নটি ‘পশ্চিম না পূর্ব’—এমন সরল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, একই সময়ে পশ্চিমের নিরাপত্তা জোট, মুসলিম বিশ্বের আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং এশিয়ার উদীয়মান বহুপাক্ষিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কতটা স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।

মক্কা চুক্তি, এসসিও ও ন্যাটো—এই তিনটি নাম তাই তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির তিনটি বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়। বরং এগুলো এমন একটি বহুমাত্রিক কৌশলের তিনটি দিক, যার লক্ষ্য তুরস্ককে কোনো একটি শক্তিবলয়ের অনুসারী না রেখে নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আগামী কয়েক বছরে এই কৌশল কতটা সফল হয়, তা শুধু তুরস্কের অবস্থান নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরেশিয়ার বৃহত্তর শক্তির ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করতে পারে।

সূত্র: ডেইলি সাবাহ, আল-জাজিরা, চায়না ডেইলি, রয়টার্স ও টিআরটি ওয়ার্ল্ড

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে: ববি হাজ্জাজ

ইসরাইলের কৌশলগত বলয়ে ঢুকেছে গ্রিস, তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনায় নতুন মাত্রা

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় চার বাংলাদেশি নিহত

বিরোধী দলের আশ্রয়ে পাটোয়ারী-সিফাতরা জিয়া পরিবারকে গালিগালাজ করছে

শরীয়াহর দৃষ্টিতে সম্পত্তি হস্তান্তর বিলে যেসব সমস্যা

ধামরাইয়ে বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে এগিয়ে এল জেলা প্রশাসন

কৃষিমন্ত্রীর মায়ের মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের শোক

ম্যাচ হেরে জরিমানাও গুনলেন জ্যোতিরা

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে: রিজভী

বগুড়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে যে কারণে