যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ধনী ব্যক্তি ও বড় অঙ্কের অর্থের প্রভাব কমাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া অনুদানের ওপর সীমা আরোপ করা উচিত। কারণ বিপুল অর্থের মালিক কয়েকজন ব্যক্তি রাজনৈতিক দলকে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে নীতিনির্ধারণে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এ পরিস্থিতি গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা বলা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সরকারে আসার আগে রাজনৈতিক অনুদানে সর্বোচ্চ ৫ লাখ পাউন্ড সীমা নির্ধারণের পক্ষে ছিলেন। তিনি ধীরে ধীরে এই সীমা আরও কমানোর কথাও বলেছিলেন। কিন্তু সরকারে আসার পর তাঁর অবস্থান বদলে গেছে এবং একই ধরনের সীমা আরোপের প্রস্তাবকে সরকার সমর্থন করছে না।
কোনো ব্যক্তি বছরে একটি রাজনৈতিক দলকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ পাউন্ড দিতে পারবেন—এমন সীমা গণতন্ত্রের ক্ষতি করবে, এমন যুক্তি দুর্বল। বরং এ ধরনের সীমা মূলত অতি ধনী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক প্রভাব কমাবে এবং দলগুলোকে কয়েকজন ধনী দাতার ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য করবে।
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বড় অঙ্কের অনুদান দেখা যায়। বার্নহামের গত এক বছরে পাওয়া ৩ লাখ ৪৫ হাজার পাউন্ড অনুদানের মধ্যে ১ লাখ ৬৪ হাজার পাউন্ড এসেছে ধনকুবের লর্ড সেইনসবেরির কাছ থেকে। অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায়ী ধনকুবের ক্রিস্টোফার হারবোর্ন ২০২৫ সালের আগস্টে রিফর্ম ইউকে দলকে একবারেই ৯০ লাখ পাউন্ড দিয়েছিলেন। এই অর্থ চলতি বছরে লেবার পার্টি যে ৮০ লাখ পাউন্ড ট্রেড ইউনিয়ন অনুদান পাবে, তার চেয়েও বেশি।
রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে ধনী ব্যক্তিদের প্রভাবের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে আরও আলোচনায় এসেছে। হারবোর্নের কাছ থেকে রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজের ২০২৪ সালে পাওয়া ৫০ লাখ পাউন্ডের অপ্রকাশিত অনুদানের তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।
তবে বড় অঙ্কের অনুদান সীমিত করার ক্ষেত্রে লেবার পার্টির ভেতরেও আপত্তি রয়েছে। যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, ধনী ও প্রগতিশীল দাতাদের অর্থ দলের জন্য প্রয়োজনীয় এবং এতে ট্রেড ইউনিয়নের ওপর দলের অতিরিক্ত নির্ভরতার অভিযোগ মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়নগুলো আশঙ্কা করছে, অনুদানের সীমা তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কয়েকজন ধনী ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া অর্থের সুবিধার তুলনায় রাজনীতিতে অতিরিক্ত অর্থের প্রভাবের ক্ষতি অনেক বেশি। লেবার এমপি স্টেলা ক্রেসির প্রস্তাবিত সংশোধনীতে শুরুতে ৫ লাখ পাউন্ড অনুদানসীমা এবং পরে তা কমানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত রাজনৈতিক তহবিলকে এই সীমার বাইরে রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
সাবেক লেবার মন্ত্রী অ্যানেলিজ ডডসও রাজনৈতিক অনুদান ও নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, যদি বড় অর্থের রাজনৈতিক প্রভাবকে ঝুঁকি হিসেবে মনে করা হয়, তাহলে নির্বাচনী ব্যয়ের বর্তমান উচ্চ সীমা কেন বহাল থাকবে—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
এদিকে রাজনৈতিক অর্থায়ন নিয়ে চলতি বছরের রাইক্ৰফট পর্যালোচনাতেও জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে বড় অর্থের প্রভাব কমাতে অনুদান ও নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা নিয়ে ভাবার সুপারিশ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে কয়েকজন ধনী ব্যক্তির বিপুল অর্থের ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। তাই অনুদানের সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয়ের সীমাও কমানো প্রয়োজন। এতে দলগুলোর বিপুল অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন কমবে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অর্থের প্রভাবও নিয়ন্ত্রণে আসবে।