হোম > বিশ্ব > যুক্তরাজ্য

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সমাধান কোন পথে

ড. ডায়ানা গালেয়েভার বিশ্লেষণী নিবন্ধ

আরব নিউজ

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য কি আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে? ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পর নিজস্ব পররাষ্ট্র ও জ্বালানিনীতিতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জি-৭ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তায় নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ইসলামিক স্টাডিজের সাবেক ভিজিটিং স্কলার ড. ডায়ানা গালেয়েভার মতে, ১৯৭৩ সালের প্রথম তেল সংকট, ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট এবং ২০১৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ধারাবাহিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে। তবে ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের সম্মিলিত প্রভাব জ্বালানি বাজার ও ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যে জ্বালানির দাম রেকর্ড পর্যায়ে

যুক্তরাজ্যে ডিজেলের গড় দাম প্রতি লিটার ২০০ দশমিক শূন্য ১ পেনিতে পৌঁছেছিল, যা দেশটির জন্য নতুন রেকর্ড। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দাম বেড়েছিল ৫৬ দশমিক ৮ পেনি বা প্রায় ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ। পেট্রলের দামও প্রতি লিটার ১৭৪ দশমিক ৭১ পেনিতে পৌঁছায়।

এদিকে মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ৫৪ ডলারে ওঠে, যা ২০২২ সালের মে মাসে রেকর্ড করা ১১৪ দশমিক ৩৮ ডলারের কাছাকাছি। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় তেল পরিশোধন কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট ডিজেল সরবরাহের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রাশিয়া থেকে আসত। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হতো। এসব সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সড়ক পরিবহনের জ্বালানির দামও বিশ্বজুড়ে বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যের ডিজেল আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে। রাশিয়ার সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে দেশটিতে ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৫ দশমিক ৮৬ ডলারে পৌঁছেছিল।

জ্বালানি মজুত ও পরিশোধন সক্ষমতায় দুর্বলতা

জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতার মুখে যুক্তরাজ্যের নিজস্ব মজুত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। দেশটিতে ডিজেলের মজুত দিয়ে আনুমানিক ৪২ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাজ্যে ১৮টি তেল শোধনাগার থাকলেও বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র চারটি।

শোধনাগারের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং আমদানিনির্ভরতা দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে এই দুর্বলতা আরো স্পষ্ট হতে পারে।

এদিকে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতির হার আগস্টের ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে সেপ্টেম্বরে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে উঠেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে জি-৭ দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বয়ে চার মাসের মধ্যে এই সরবরাহ ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্রেক্সিট কি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে?

২০২০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পর যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, ব্রেক্সিটের ফলে যে অর্থনৈতিক সুবিধার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তবে বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে যুক্তরাজ্যের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নতুন কৌশলগত সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ০ দশমিক ৫ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছিল। বছরের প্রথমার্ধে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবেও যুক্তরাজ্যের অবস্থান ছিল উল্লেখযোগ্য।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজস্ব উদ্যোগ জোরদার করতে পারে। জি-৭-এর মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে।

ব্রেক্সিট-পরবর্তী ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ ধারণাকে কার্যকর করতে হলে শুধু ইউরোপের বাইরে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করলেই চলবে না; বরং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তার বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দিতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা যুক্তরাজ্যের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে জরুরি মজুত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প পথ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষায় যৌথ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।

তবে ব্রেক্সিট-পরবর্তী স্বাধীনতা নিজে থেকেই জ্বালানি সংকটের সমাধান নিশ্চিত করে না। যুক্তরাজ্যের সীমিত মজুত, কমে যাওয়া শোধনাগার এবং আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও কার্যকর নীতি প্রয়োজন। পাশাপাশি যুদ্ধজনিত সরবরাহ বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় একক দেশের উদ্যোগের পাশাপাশি বহুপক্ষীয় সহযোগিতাও অপরিহার্য।

বর্তমান সংকট যুক্তরাজ্যের সামনে নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। ব্রেক্সিটের পর অর্জিত নীতিগত স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে জি-৭ ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াতে পারলে দেশটি নিজের নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায়ও অবদান রাখতে পারে।

ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভ করায় ৯৪ বছরের ইহুদি আইনজীবী গ্রেপ্তার

পরিবারসহ ২৭ ইসরাইলি কূটনীতিককে বহিষ্কার করবে যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যে নৌপথে আসা প্রায় সব নারীই ধর্ষণের শিকার: শাবানা মাহমুদ

ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাজ্যে ডিজেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ

যুক্তরাজ্য আবার ইইউতে যোগদানের চিন্তা করছে: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি আর্জেন্টিনার

গাজা ইস্যুতে ইসরাইলকে কঠোর বার্তা ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে গ্রেপ্তার, ইরানের যোগসূত্র নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

ইরানে হামলায় ব্যবহৃত যুক্তরাজ্যের মার্কিন ঘাঁটির কাছে ৫ জন গ্রেপ্তার

মহাকাশে নিরাপত্তা জোরদারে নতুন সামরিক স্কোয়াড্রন গড়ল যুক্তরাজ্য