সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটের জলে-স্থলে মিশে আছে খানজাহান আলীর স্মৃতি। তার হাত ধরে এই পুণ্যভূমিতে ইসলামের প্রচার হয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাটিতে ৬০০ বছর আগের সাধক ও সেনাপতি খানজাহানের প্রভাব এখনো আছে। এখানে ইসলামপন্থি ও জাতীয়তাবাদী মুসলমানের আধিপত্য বেশি। ভোটের মাঠেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও তাদের সমর্থন বড় নিয়ামক হতে পারে।
বাগেরহাটের ৯টি উপজেলা নিয়ে জাতীয় সংসদের আসন চারটি। সব আসনে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন রাজনৈতিক নেতারা। তাদের মধ্যে বৃহত্তম দল বিএনপির অনেক নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী। প্রায় সব আসনে একই চিত্র। এতে দলটির মধ্যে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে এটি আশীর্বাদ হতে পারে জামায়াতের জন্য। পাশপাাশি দাঁড়িপাল্লার একক প্রার্থী হওয়ায় প্রচারও তুঙ্গে। এ ছাড়া সম্ভাব্য ইসলামপন্থি জোট পাল্টে দিতে পারে ভোটের সব হিসাব-নিকাশ। তবে তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ এবং আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
বাগেরহাট-১ (মোল্লাহাট, ফকিরহাট ও চিতলমারী)
যুগ যুগ ধরে আসনটিতে রাজত্ব করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনাও এখান থেকে নির্বাচন করেছেন। মাঝে একবার সুযোগ পেয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী। এবার গণহত্যাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সবাই পলাতক থাকায় পাল্টে গেছে মাঠের চিত্র। এখানে আগামী নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। জাতীয়তাবাদী দলের একাধিক হেভিওয়েট নেতা মাঠে থাকায় অন্তর্কোন্দলের কারণে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারে ধানের শীষ।
বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন— দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ ওয়াহিদুজ্জামান দিপু, জেলা বিএনপির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ রানা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি শেখ মুজিবুর রহমান, মোল্লাহাট উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শেখ হাফিজুর রহমান এবং ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সদ্য সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদুজ্জামান ওহিদ।
শেখ দিপু বলেন, ‘আওয়ামী সরকারের প্রতিহিংসার শিকার নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। এর আগে দলে আমার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৮ সালে ধানের শীষ পেয়েছিলাম। এবারও পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।’
ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ পেয়েছিলাম। শেখ হাসিনা পতনের আন্দোলনে আমার সাহসী ভূমিকা ও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়তার কারণে আবার মনোনয়ন পাব বলে বিশ্বাস রয়েছে।’
ওহিদ জানান, তিনি ছাত্র রাজনীতি থেকে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। তবে জনগণের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন। জামায়াতে ইসলামী আগেই প্রার্থী ঘোষণা করায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন খুলনা মহানগর সাংগঠনিক টিমের সদস্য অধ্যাপক মশিউর রহমান খান। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ নিজ এলাকায় ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন।
তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষ দুঃশাসনের হাত থেকে মুক্তি চায়। তারা আগে কখনো স্বস্তি পায়নি। এবার তারা চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চায়। এজন্য জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’
বাগেরহাট-২ (সদর ও কচুয়া)
জেলা শহরের আসন হওয়ায় সবার নজর এখানে। আবার স্বাধীনতার পর থেকে এই আসন থেকে যে দল থেকেই এমপি নির্বাচিত হয়েছে, তারাই সরকার গঠন করেছে। এখানেও বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তারা হলেন—জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও তিনবার দলের টিকিট পাওয়া এমএ সালাম, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা থেকে মুক্তি পাওয়া নেতা খান মনিরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সদস্য ব্যারিস্টার জাকির হোসেন, বিএনপি সমর্থিত সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা এমএএইচ সেলিম, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার এটিএম আকরাম হোসেন তালিম, জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ফকির তারিকুল ইসলাম এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুজা উদ্দিন মোল্লা সুজন।
খান মনিরুল বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কেস পার্টনার ছিলাম। ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অসহায় শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করেছি। তাই দল আমাকে নমিনেশন দিলে বিজয়ী হব।’
ব্যারিস্টার জাকির হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী জেল-জুলুমের শিকার অসংখ্য নেতাকর্মীকে আইনি সহায়তা দিয়েছি। তারেক রহমানের মামলা লড়েছি। নিজে বহুবার জেল খেটেছি। দল সঠিক মূল্যায়ন করলে আমিই নমিনেশন পাব।’
এ ছাড়া ফকির তারিকুল ফ্যাসিস্ট পতনের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সুজা উদ্দিন তরুণ প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয় এবং তার বিরুদ্ধে ৩০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম আমাকে সমর্থন করে। আমি জনগণের অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর।’
বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় তাদের মধ্যে কোন্দলের আশঙ্কাও বেশি। এ কারণে সুবিধা পেতে পারেন জামায়াতের একক প্রার্থী। দলটির জেলা যুব বিভাগের সভাপতি শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাত মনোনয়ন পাওয়ার পরই মাঠে নেমে পড়েছেন। তরুণ এই রাজনীতিবিদ ছাত্রশিবিরের রাজনীতি করায় শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিশাল কর্মিবাহিনীও তৈরি করেছেন। তিনি মনে করেন, এমনিতেই এলাকায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। এর বাইরে বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে স্থানীয় বিএনপির দলীয় কোন্দল। সব মিলিয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী তিনি।
বাগেরহাট-৩ (রামপাল ও মোংলা)
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীমের বাড়ি এই আসনে হওয়ার সবার নজর ছিল তার দিকে। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি মনোনয়ন চাইলে আর কেউ চেষ্টা করবেন না। কিন্তু তা আর হয়নি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন তার প্রতিন্দ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছেন। অন্য প্রতিযোগীরা হলেনÑজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা শেখ আবদুল হালিম খোকন। এ ছাড়াও বেশ কয়েকজন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও আরাফাত রহমান কোকো ক্রীড়া সংসদের সাধারণ সম্পাদক শামীমুর বলেন, তিনি ৩৬টি রাজনৈতিক মামলার আসামি ছিলেন। বারবার কারাবরণ করেছেন এবং পুলিশের গুলিতে তিনবার রক্তাক্ত হয়েছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আত্মত্যাগ করেছেন। দল সঠিক মূল্যায়ন করলে তিনিই এবার মনোনয়ন পাবেন বলে আশাবাদী।
অন্যদিকে ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম লায়ন গ্রুপের সহযোগিতায় বিনামূল্যে হাজার হাজার গরিব মানুষের চোখের অপারেশনের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি আওয়ামী সরকারের আমলে নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ান। এসব বিবেচনায় দল তাকে টিকিট দেবে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস।
জামায়াতের টিকিট পেয়ে প্রচার চালিয়ে ইতোমধ্যে ভোটারদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির শূরা সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ আবদুল ওয়াদুদ। তিনি ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে একাধিকবার এ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তাকে পরাজিত দেখানো হয়। তিনি বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে আছে। তারা আর কোনো দানবকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশা রয়েছে। যদি এমন নির্বাচন হয়, তাহলে আমার জয় কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না ইনশাল্লাহ।’
বাগেরহাট-৪ (মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা)
সুন্দরবনঘেঁষা আসনটিতে বেশ আগে থেকেই জামায়াতের আধিপত্য রয়েছে। আগে দুবার মনোনয়ন পেয়ে এমপিও নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী। এবারও বিভিন্ন কৌশলে জয় ঘরে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন দলটির জেলা শাখার শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ আবদুল আলিম। তিনি বিগতদিনে মোড়েলগঞ্জ-শরণখোলার সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নিয়ে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। তিনি মনে করেন, জনগণের সঙ্গে তার আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সুখে-দুঃখে তিনি এলাকার মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। এতেই ইসলামপন্থি অধ্যুষিত আসনটির অধিকাংশ ভোটারের আস্থা তিনি অর্জন করতে পেরেছেন। এর সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির অন্তর্কোন্দল তার নির্বাচনি মাঠে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন—বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি কাজী খায়রুজ্জামান শিপন, বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, তাঁতীদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ড. কাজী মনিরুজ্জামান মনির, জেলা বিএনপির সদস্য ফারহানা জাহান নিপা এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মনিরুল হক ফরাজী।
কাজী খায়রুজ্জামান ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনেও তার ব্যাপক ভূমিকা ছিল। এবারও তিনি আশাবাদী।
ড. ওবায়দুল বিএনপির দুঃসময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নির্বাচনি এলাকায় বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে সামনে থেকে ভূমিকা রেখেছেন। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও চোখে পড়ার মতো ভূমিকা রয়েছে তার। এ ছাড়া ড. মনিরও আন্দোলন-সংগ্রামে একাধিক মামলার আসামি হয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন।
ফারহানার বাবা বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মরহুম শামসুল আলম তালুকদার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সাহসী ভূমিকা পালন করতে গিয়ে হামলা-মামলার শিকারও হন তিনি।
মনিরুল হক বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপি করি। ফ্যাসিবাদী সরকার পতন আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখে ১৭ বছরে ১৬টি রাজনৈতিক মামলায় ছয়বার জেল খেটেছি। জনগণের জন্য লড়াই করায় দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আশা করি ।’
সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট নেতা মনোনয়ন চাওয়ায় দলীয় কোন্দল অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেছে। এতে নির্বাচনের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চা দোকানদার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিএনপির মধ্যে ঐক্য তৈরি না হলে ভোটের মাঠে রাজত্ব করতে পারে জামায়াত। এ ছাড়া আগের মতো প্রার্থী ও ভোট জনগণ চায় না। এই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জয়-পরাজয় নির্ধারণের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিকদার জামাল উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অব্যাহতভাবে অমান্য করলে দলটির ভোটের মাঠে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে এবার তরুণ ভোটারদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকবে। আবার ইসলামপন্থিদের জোট হলে অন্যরকম ফলাফল হতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

