রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঐতিহ্যবাহী বেনারসি পল্লী কালের বিবর্তনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এই পল্লীর উন্নয়নে গড়ে তোলা ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা ভবনটিও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এই ভবনটি রক্ষায় নেওয়া হচ্ছে না কোনো উদ্যোগ।
জানা গেছে, একসময় তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের হাবু তাঁতিপাড়া। ঘরে ঘরে চলত তাঁত। তৈরি হতো বেনারসি শাড়ি, কাতানসহ নানা ধরনের কাপড়। এই তাঁতশিল্পের বিকাশে প্রশিক্ষণ, উৎপাদন ও বিপণন সুবিধা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। নির্মাণ করা হয় ২৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা ব্যয়ে দ্বিতল একটি ভবন। কিন্তু সেই ভবন এখন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। দু-এক বছর নয়, প্রায় ১৪ বছর ধরে ভবনটিতে নেই কোনো কার্যক্রম। আর যে বেনারসি পল্লির উন্নয়নের কথা ভেবে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই গঙ্গাচড়ার বেনারসি পল্লিও অনেক আগেই বন্ধ হয়ে কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গজঘণ্টার হাবু তাঁতিপাড়ায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিসিকের সেই দ্বিতল ভবন। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের চারপাশে আগাছা জন্মেছে। দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব। বিভিন্ন স্থানে খসে পড়েছে পলেস্তারা। দরজা-জানালা ও ভেতরের আসবাবপত্র নষ্টপ্রায়। বিদ্যুৎ সংযোগসহ অন্যান্য অবকাঠামোও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সীমানাপ্রাচীরের কিছু অংশও ক্ষতিগ্রস্ত।
স্থানীয় তাঁতিরা জানান, ভবনটি নির্মাণের সময় তাদের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। এখানে স্থানীয়ভাবে তৈরি বেনারসি কাপড় প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা হবে, তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা করা হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় প্রকল্প আর চালু না হওয়ায় ভবনটি কার্যক্রমের মুখ দেখেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় একের পর এক তাঁত। কর্মসংস্থানের বিকল্প খুঁজে নেন অনেক কারিগর।
বিসিক রংপুর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গঙ্গাচড়ার বেনারসি পল্লির উন্নয়ন ও তাঁতিদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রথম প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি ট্রেডে ৪৩টি প্রশিক্ষণ ব্যাচে ৮৬০ জন তাঁতি প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ ও ঋণের মাধ্যমে তাঁতশিল্পে কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে বেনারসি শাড়ি ও অন্যান্য কাপড় প্রদর্শন এবং বিক্রির জন্য ২ হাজার ২৫২ বর্গফুট আয়তনের দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় ২৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকল্প চালু না হওয়ায় ভবনটিতে আর কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।
হাবু গ্রামের তাঁতশিল্পের প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রহমান বলেন, ‘আমার এই শিল্পটা এক দিনে শেষ হয়নি। ধীরে ধীরে শেষ হয়েছে। বিসিকের কর্মকর্তারা যদি সময়মতো নজর দিতেন, তাঁতিদের পাশে দাঁড়াতেন, তাহলে হয়তো আজ এই অবস্থা হতো না। সরকারি টাকা খরচ করে ভবন বানানো হলো, কিন্তু ১৪ বছর ধরে সেই ভবন পড়ে আছে। কুটিরশিল্পের কর্মকর্তারা যদি ভবনটা চালু করা, তাঁতিদের প্রশিক্ষণ, সুতা, মেশিন আর কাপড়ের বাজারের ব্যবস্থা করতেন, তাহলে হাবুর তাঁতশিল্পটা টিকিয়ে রাখা যেত। কর্মকর্তাদের অবহেলা আর দীর্ঘদিনের অযত্নে আমার চোখের সামনে সম্ভাবনাময় এই শিল্পটা শেষ হয়ে গেছে।’
স্থানীয় তাঁতশিল্পী মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এই এলাকায় অনেক তাঁত ছিল। বিসিক থেকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল সরকারি সহযোগিতায় বেনারসি শিল্প আরো বড় হবে। কিন্তু ভবনটি চালু হলো না, প্রকল্পও আর হলো না। এখন আগের মতো তাঁত নেই। তাঁতপল্লিতে তাঁতশিল্প বিলুপ্ত হয়ে গেছে।’ আরেক তাঁতশিল্পী সুমন মিয়া বলেন, ‘ভবনটি পড়ে আছে, অথচ তাদের উৎপাদিত কাপড় বিক্রি ও প্রদর্শনের জন্য এমন একটি কেন্দ্রের প্রয়োজন ছিল। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া হলে হয়তো এই পল্লি এভাবে হারিয়ে যেত না।’
তাঁতশিল্পী মোহছেনা বেগম বলেন, ‘বেনারসি শিল্প টিকলে আমরাও ভালো থাকব। কিন্তু এখন পরিস্থিতি খারাপ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। বিসিকের নির্মিত বেনারসি কাপড় বিক্রি ও প্রদর্শনী কেন্দ্রটি এখনো চালু হয়নি। ভবনটি ফেলে না রেখে সরকারি নিয়মে কোনো তাঁতিকে ব্যবহারের সুযোগ দিলে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি কাজে লাগত।’ স্থানীয়দের অভিযোগ, গঙ্গাচড়ার তাঁতশিল্প অনেক আগেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে তৈরি বেনারসি শাড়িও এখন আর উৎপাদিত হচ্ছে না। অথচ বিভিন্ন শোরুমে ভারত থেকে আনা শাড়ি স্থানীয়ভাবে তৈরি বলে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত পণ্য সম্পর্কে ভুল তথ্য পেয়ে ক্রেতা প্রতারিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রংপুর বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক এহেছানুল হক বলেন, ‘বেনারসি পল্লি উন্নয়ন প্রকল্পের শেষের দিকে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় প্রকল্প চালু না হওয়ায় ভবনটিতে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে শোরুমগুলো আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের একটি শাড়ি তৈরি করতে যে খরচ হয়, সেই দামে তা বিক্রি করা সম্ভব হয় না। ভারত থেকে শাড়ি এনে বিক্রি করাই তুলনামূলক লাভজনক। এতে ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের এক পণ্য, এক গ্রাম প্রকল্পের আওতায় নতুন করে কার্যক্রম নেওয়ার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি অনুমোদন হলে বেনারসি পল্লির উন্নয়নে নতুন করে কিছু করা সম্ভব হতে পারে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

