আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ফেনীর ৩ নদীর বাঁধ ভাঙন, প্লাবিত ৩২ গ্রাম

এস এম ইউসুফ আলী, ফেনী

ফেনীর ৩ নদীর বাঁধ ভাঙন, প্লাবিত ৩২ গ্রাম

টানা বৃষ্টি ও ভারতীয় উজানের পানির স্রোতে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অন্তত ১৫টি স্থান ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। এতে জেলার দুই উপজেলার ৩২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হাজরো পরিবার। এছাড়া সোনাগাজী, দাগনভূঞা ও ছাগলনাইয়া উপজেলার নিম্নাঞ্চলের রাস্তা-ঘাট, পুকুর-মাছের ঘের এবং খেত-খামার পানিতে ডুবে গেছে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার সকল ১০টা পর্যন্ত জেলা আবহাওয়া অফিসের সর্বশেষ তথ‍্যমতে, ফেনীতে ৭ জুলাই সকাল ৯টা থেকে ৯ জুলাই সকাল ৯টা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টায় ৫৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

Feni (2)

পানি উন্নয়ন বোর্ড ফেনীর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মুহুরী নদীর পরশুরাম গেজ স্টেশনে ৮ জুলাই সকাল ৬টায় পানির লেভেল ৬.৯৭ মিটার, রাত ৮টায় ১৩.৮৫ মিটার ছিল। বিপদসীমা ১২.৫৫ মিটার, এই সময়ে প্রায় ৭ মিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। যা বিপদসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় পরশুরাম উপজেলায় মুহুরী নদীর ডান তীরে জিরো পয়েন্টে বাংলাদেশ-ভারত বাঁধের সংযোগস্থল দিয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। মুহুরী নদীর উভয় তীরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে পরশুরাম উপজেলায়, জঙ্গলগোনা ২টি (মুহুরী, ডান তীর), উত্তর শালধর ১টি (মুহুরী নদীর ডান তীর), নোয়াপুর ১টি (মুহুরী নদীর বাম তীর), পশ্চিম অলকা ১টি (মুহুরী নদীর বাম তীর), ডি এম সাহেবনগর ১টি (সিলোনিয়া নদীর বাম তীর), পশ্চিম গদানগর ১টি (সিলোনিয়া নদীর বাম তীর), দক্ষিণ বেড়াবাড়ীয়া ১টি (কহুয়া নদীর বাম তীর), পূর্ব সাতকুচিয়া ১টি (কহুয়া নদীর ডান তীর), উত্তর টেটেশ্বর ১টি (কহুয়া নদীর বাম তীর) সহ ১০টি স্থানে ভাঙন হয়েছে। ফুলগাজী উপজেলায় দেড়পাড়া ২টি (মুহুরী নদীর ডান তীর), শ্রীপুর ১টি (মুহুরী নদীর ডান তীর), উত্তর দৌলতপুর ১টি (কহুয়া নদীর ডান তীর), কমুয়া ১টি (সিলোনিয়া নদীর বাম তীর) সহ ৫টি ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া, বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। সবশেষ সকাল ৯টায় পানির লেভেল ১৩.৩১ মিটার।

Feni (3)

এদিকে জেলার বিদ‍্যুত বিতরণ বিভাগ ও ফেনীর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ‍্যমতে, সদর উপজেলা ও সোনাগাজী, পরশুরাম এবং ফুলগাজীর অনেক বাসা, বাড়ি ও ব‍্যবসা প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক মিটার এবং সাবস্টেশন পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বৈদ্যুতিক পিলারের গোড়া থেকে মাটি সরে গিয়ে ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনা এড়াতে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। অবস্থার অবনতি হলে এর পরিধি বাড়তে পারে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে।

পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া এলাকার বাসিন্দা জাকিয়া আক্তার বলেন, মঙ্গলবার ‘রাত ৮টা থেকে তাদের ঘরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এক পর্যায়ে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। গেল বছরের বন্যায়ও সব জিনিসপত্র হারিয়ছিলেন। ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আবারো বন্যার পানিতে স্বপ্ন ডুবছে।

মির্জানগর ইউনিয়নের পূর্ব রাঙামাটিয়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পাউবো কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে বল্লামুখা বাঁধের প্রবেশ মুখটি বন্ধ করা হয়নি। সময়মতো বাঁধের এ স্থানটি বন্ধ করা হলে পানি ঢোকার সুযোগ ছিল না। প্রতিবছরই কিছু মানুষের দায়সারা কাজের কারণে বড় একটি জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি পোহাতে হয়।’

পরশুরামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। মানুষজন এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে আসছেন না। এই উপজেলায় এখন পর্যন্ত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙনের ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।’

ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহরিয়া ইসলাম বলেন, এ উপজেলায় শতাধিক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন। তাদের জন্য শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই উপজেলায় এখন পর্যন্ত ১৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বুধবার এ উপজেলার উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

Feni (4)

জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, টানা দুদিন ধরে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বুধ ও বৃহস্পতিবারও জেলাজুড়ে মাঝারি বা ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তার হোসেন বলেন, নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে রাত ১২টার পর মুহুরী নদীর পানি কিছুটা কমেছে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পানি প্রবাহ বাড়বে। আরো নতুন বাঁধ ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে।

ফেনীর জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, ফুলগাজী উপজেলায় ৩২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৬৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পরশুরাম উপজেলায় ৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এরইমধ্যে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন। দুর্গতদের জন্য শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবারের জন্য সাড়ে ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন