চরফ্যাশনে আবেদন ছাড়াই একাধিক ভোটারের এলাকা পরিবর্তনের অভিযোগ

চরফ্যাশনে আবেদন ছাড়াই একাধিক ভোটারের এলাকা পরিবর্তনের অভিযোগ
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে কোনো আবেদন ও মোবাইল ফোনে ওটিপি (OTP) যাচাই ছাড়াই একাধিক ভোটারের ভোটার এলাকা পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। পরে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের ভোটার এলাকা আগের ইউনিয়নে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর দুপুরে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় তারা ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আমার দেশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চরফ্যাশন উপজেলার ১০ নম্বর হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে আসন্ন নির্বাচনে মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য এ পর্যন্ত চারজন প্রার্থী আত্মপ্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের ভোটার এলাকা তাদের অজান্তে এবং কোনো ধরনের সম্মতি ছাড়াই অন্য ইউনিয়নে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগী মেম্বার পদপ্রার্থী ও হাজারীগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসনাইন মঞ্জু জানান, তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আব্দুল শহীদ প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন। শত চেষ্টা ও দৌড়ঝাঁপ করেও সমাধান না পেয়ে তিনি বিষয়টি অন্য প্রার্থীদের জানান। পরে আব্দুল শহীদ জানতে পারেন, তার নিজের ভোটার এলাকাও পরিবর্তন করে জাহানপুর ইউনিয়নে নেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি শুনে সন্দেহ হলে হাসনাইন মঞ্জু অনলাইন নির্বাচন সার্ভারে নিজের তথ্য যাচাই করেন। সেখানে তিনি দেখতে পান, ১০ নম্বর হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার হওয়া সত্ত্বেও তার ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে জাহানপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে।

পরে উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, চরফ্যাশন পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সজিব নামের এক ব্যক্তির আবেদনের ভিত্তিতে এ স্থানান্তর করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, কোনো ব্যক্তির নিজের ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদনের ক্ষেত্রে যেখানে মোবাইল ফোনে ওটিপি যাচাই, জাতীয় পরিচয়পত্র, বিদ্যুৎ বিল এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নাগরিক সনদের মতো নথি প্রয়োজন, সেখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির আবেদনে কীভাবে তিনজন প্রার্থীর ভোটার এলাকা পরিবর্তন করা হলো।

ঘটনার পর হাসনাইন মঞ্জু উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সৌমিক রহমানকে সরাসরি না পেয়ে মুঠোফোনে বিষয়টি জানান। তিনি আগামী রোববারের মধ্যে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন বলে হাসনাইন মঞ্জু জানান। পরে প্রশাসনের তৎপরতা ও আবেদনের পর কোনো ধরনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যে হাসনাইন মঞ্জুর ভোটার এলাকা পুনরায় হাজারীগঞ্জে ফিরিয়ে আনা হয়।

হাসনাইন মঞ্জু আমার দেশকে বলেন, সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি হাজারীগঞ্জ ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার হিসেবে ভোট দিয়েছেন। তার প্রশ্ন, আবেদন ছাড়া কীভাবে তাকে পাশের জাহানপুর ইউনিয়নের ভোটার করা হলো। ভোটার এলাকা পরিবর্তনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ভোটার এলাকা স্থানান্তর বা সংশোধনের আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। সেখানে কোনো বৈধ নথি ছাড়া কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভোটার এলাকা পরিবর্তন এবং পরে তা আবার আগের এলাকায় ফিরিয়ে আনার ঘটনায় জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, ১০ সেপ্টেম্বর চরফ্যাশন নির্বাচন কার্যালয়ের ভেতরে লাইভে এসে ঘটনার প্রতিবাদ করেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, আসন্ন নির্বাচন থেকে যোগ্য প্রার্থীদের ছিটকে ফেলতে নির্বাচন কার্যালয়ের অসাধু একটি চক্র অর্থের বিনিময়ে এ ধরনের কাজ করে যাচ্ছে।

একটি সূত্রের দাবি, চরফ্যাশন নির্বাচন কার্যালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে সাদ্দাম বকশী (মো. সাদ্দাম) নামের একজন কর্মচারী জড়িত। তিনি ভোলার লালমোহন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ‘স্ক্যানিং এন্ড ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স অপারেটর’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সেখানে কাজ না করে চরফ্যাশন নির্বাচন কার্যালয়ে কর্মরত থেকে নির্বাচনের সময় বিভিন্ন অনিয়ম, নির্বাচনি কর্মকর্তা নিয়োগ ও ভোটার স্থানান্তরের মতো কাজে জড়িত থেকে অর্থ নেন বলে সূত্রটির দাবি।

সূত্রটির আরও দাবি, সাদ্দাম বকশীকে চরফ্যাশন নির্বাচন কার্যালয় থেকে সরিয়ে দিলে অনিয়ম ও দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যাবে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাদ্দাম বকশীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

চরফ্যাশন আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট রমিজ হোসেন বলেন, একজন ভোটারকে তার আবেদন ছাড়া এবং তার অজান্তে অন্য এলাকায় স্থানান্তরের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তা না হলে একজন নাগরিক তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিদ্দিক উল্লাহ মিয়া বলেন, ভোটাধিকার প্রয়োগ একজন নাগরিকের অধিকার। একজন ভোটার কোন এলাকায় থাকবেন এবং ভোটার এলাকা পরিবর্তন করবেন কি-না, সেটি তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয়। কোনো ব্যক্তির আবেদন ছাড়া এবং তাকে না জানিয়ে তার ভোটার এলাকা অন্যত্র পরিবর্তন করা গুরুতর অপরাধ।

তিনি বলেন, তদন্তে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ ধরনের দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হলে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা ও অসদাচরণের দায়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বেসরকারি পর্যায়ের কেউ জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।

চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সৌমিক রহমান আমার দেশকে বলেন, ভুক্তভোগী নিজে ভোটার স্থানান্তরের আবেদন করেননি। তবে তার জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে দুষ্ট প্রকৃতির কেউ আবেদন করেছে। বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে ভোটার স্থানান্তরের আবেদন নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমাদের কার্যালয়ের কেউ এই অনিয়মে জড়িত থাকলে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন, ভোটারকে তার আবেদন ছাড়া অন্য এলাকায় স্থানান্তরের ঘটনাটি আমি অবগত হয়েছি। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন