দাদনের ফাঁদে ৫ হাজার জেলে, ইলিশ থেকেও বঞ্চিত সীতাকুণ্ডবাসী

দাদনের ফাঁদে ৫ হাজার জেলে, ইলিশ থেকেও বঞ্চিত সীতাকুণ্ডবাসী

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ডোংখালী বগাচতর, বাঁকখালী, বসতনগর, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, বাড়বকুণ্ড, সোনাইছড়ি, ভাটিয়ারী, সলিমপুরসহ উপকূলের ১৯টি মাছঘাটে ভিড়ছে ইলিশভর্তি ট্রলার। ঘাটজুড়ে চলছে মাছ খালাস, বরফজাতকরণ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালান পাঠানোর ব্যস্ততা। অথচ উপকূলীয় মাছঘাটগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইলিশের বড় অংশ স্থানীয় বাজারে আসে না। আড়ত থেকেই ট্রাক ভর্তি করে মাছ পাঠানো হচ্ছে ঢাকা, যশোর, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব মাছের একটি অংশ বিদেশেও রপ্তানি হয়। ফলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দাদননির্ভর মৎস্য বাণিজ্য, আড়তকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট এবং বহিরাগত পাইকারদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় বাজারে ইলিশের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দাদনের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়েছেন পাঁচ হাজারের বেশি জেলে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সীতাকুণ্ড পৌরসভার উত্তর বাজারের মাছের আড়ত ঘিরেই সবচেয়ে বড় পাইকারি বেচাকেনা হয়। এসব আড়তের নিয়ন্ত্রণ বহিরাগত পাইকার বা বেহারি ব্যবসায়ীদের হাতে। তারা নগদ অর্থের জোরে একযোগে বিপুল পরিমাণ মাছ কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন।

বর্তমানে আকারভেদে প্রতি মণ ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৭ হাজার টাকায়। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ইলিশের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা। ফলে উপকূলের সাধারণ মানুষের কাছে ইলিশ এখন বিলাসী খাদ্যে পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, সীতাকুণ্ডে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ৫ হাজার ৪১৮ জন জেলে রয়েছেন। তাদের অধিকাংশেরই নিজস্ব পুঁজি নেই। ট্রলারের জ্বালানি, বরফ, জাল মেরামত ও খাদ্য ব্যয়ের জন্য মৌসুমের শুরুতেই আড়তদার ও মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিতে বাধ্য হন তারা। দাদনের শর্ত অনুযায়ী ধরা সব মাছ নির্ধারিত আড়তেই বিক্রি করতে হয়। ফলে বাজারে ইলিশের দাম বাড়লেও তার সুফল পান না জেলেরা। লাভের বড় অংশ চলে যায় দাদনদাতা, আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। অনেক জেলে বছরের পর বছর ঋণের এই চক্র থেকে বের হতে পারছেন না।

সোনাইছড়ি উপকূলের জেলে অনু জলদাস আমার দেশকে বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরি। কিন্তু দাদনের কারণে নিজের ইচ্ছামতো মাছ বিক্রি করতে পারি না। সব হিসাব শেষে লাভের বড় অংশ মহাজনের হাতে চলে যায়। আমরা শুধু শ্রম দিই।

স্থানীয় বাসিন্দা কানু নাথ বলেন, ঘরের পাশের সাগর থেকে ইলিশ উঠছে, অথচ পরিবারের জন্য কিনতে পারছি না। দুই হাজার টাকার বেশি কেজি দামে মাছ কেনা আমাদের মতো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

ক্রেতা জাহিদুল ইসলাম বলেন, বহিরাগত পাইকারদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রতিযোগিতা করার সুযোগ নেই। ভালো মাছ আড়ত থেকেই বাইরে চলে যায়। উপকূলে থেকেও আমরা ইলিশের স্বাদ পাই না।

রাজবাড়ী হোটেলের মালিক সোহেল বলেন, আড়তে এক মণ ইলিশের দাম ১ লাখ ৭ হাজার টাকা। এই দামে ইলিশ কিনে ব্যবসা করা সম্ভব নয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ী হাসেম ডিলার বলেন, সপ্তাহে অন্তত একদিন বাইরের জেলায় ইলিশ পাঠানো বন্ধ রেখে স্থানীয় বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করা হলে সাধারণ মানুষ ন্যায্য দামে ইলিশ কিনতে পারবে।

কুমিরা ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে উপজেলার প্রায় ১ হাজার ৫০০টি মাছ ধরার নৌকা থেকে প্রতি নৌকায় ২ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করছে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোতাসিম বিল্লাহ বলেন, এ ধরনের অভিযোগ আমিও শুনেছি। কারা আমার নাম ভাঙিয়ে জেলেদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে, তা তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন।

তিনি জানান, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ইলিশ আহরণের প্রধান মৌসুম। অক্টোবর মাসে মা-ইলিশ সংরক্ষণে সরকার ২২ দিনের আহরণ নিষিদ্ধ রাখে। এ সময় নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্য সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেন, ইলিশের অতিরিক্ত দামের কারণে সাধারণ মানুষ মাছ কিনতে পারছে না। স্থানীয় মানুষের স্বার্থে সপ্তাহে অন্তত একদিন বাইরের জেলায় ইলিশ সরবরাহ বন্ধ রেখে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য সরাসরি বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন