বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। এটি কেবল একটি নীতিগত দাবি কিংবা প্রশাসনিক সংস্কারের আন্দোলন ছিল না; বরং ছিল বৈষম্যহীন, মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন প্রজন্মের আত্মপ্রকাশ। স্বাধীনতার পর দেশের তরুণ সমাজ যে সাহস, দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান তারই এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। এই আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শক্তিই একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবসময়ই জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে নেতৃত্ব দিয়েছে। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম—প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ হিসেবে আমাদের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দায়িত্বশীল কর্মসূচির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, গণমিছিল, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ উদ্যোগের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, যুক্তি, ন্যায় এবং মানবিক মূল্যবোধই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন কখনোই নিজস্ব ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ ছিল না। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা মেডিকেল কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালিত কর্মসূচি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি শক্তিশালী গণঐক্য গড়ে তোলে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টা শুধু আন্দোলনকে গতিশীল করেনি, বরং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দেশের অন্যান্য স্থানের মতো খুলনাতেও আন্দোলন দমনের নানা প্রচেষ্টা ছিল। প্রতিকূল পরিস্থিতি, অনিশ্চয়তা ও নানা ধরনের চাপের মধ্যেও আমাদের শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল কর্মসূচি অব্যাহত রাখে।
তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানকে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থী শহীদ মীর মাহফুজুর রহমানের (মুগ্ধ) আত্মত্যাগ। গণিত ডিসিপ্লিনের এই শিক্ষার্থী কেবল একজন মেধাবী তরুণ ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানবিকতার এক অনন্য প্রতীক। আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে আন্দোলনরত মানুষদের মধ্যে পানি বিতরণ করছিলেন। তার সেই মানবিক দায়িত্ব পালনকালে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাতবরণ করেন।
মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তার উচ্চারিত সেই অবিসংবাদিত আহ্বান ‘ভাই, পানি লাগবে, পানি’ আজ বাংলাদেশের ইতিহাসে মানবিকতার এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে আছে। সেই কয়েকটি শব্দ আমাদের শেখায়, প্রকৃত বীরত্ব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নিহিত থাকে। মুগ্ধ তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে মানবিকতা কখনো পরাজিত হয় না।
মীর মুগ্ধের শাহাদাত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারকে গভীরভাবে শোকাহত করলেও একই সঙ্গে আমাদের দায়িত্ববোধকে আরো শক্তিশালী করেছে। তার আত্মত্যাগ শুধু একটি পরিবারের নয়, শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; এটি সমগ্র জাতির সম্পদ। তার স্মৃতি আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালনই একজন সচেতন নাগরিকের সর্বোচ্চ পরিচয়।
শহীদ মুগ্ধের শাহাদাতের পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তার রুহের মাগফিরাত কামনায় ক্যাম্পাসে গায়েবানা জানাজার আয়োজনের দাবি জানান। ইতিহাসের স্বার্থে এটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সে সময়কার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর আবেগ ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের দৃঢ় অবস্থান, শিক্ষকসমাজের একটি অংশের নৈতিক সমর্থন এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের মানবিক প্রত্যাশার ফলে শেষ পর্যন্ত গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেই জানাজা ছিল শুধু একজন শহীদ শিক্ষার্থীর জন্য দোয়ার আয়োজন নয়; বরং মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়ের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের এক শক্তিশালী প্রতীক।
শহীদ মীর মাহফুজুর রহমানের (মুগ্ধ) আত্মত্যাগের পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার গভীর শোক ও বেদনায় মুহ্যমান হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়েই শুরু হয় একজন শহীদ শিক্ষার্থীর স্মৃতিকে মর্যাদার সঙ্গে ধারণ করার প্রয়াস। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল তার একাডেমিক সাফল্যে রচিত হয় না; বরং সংকটের সময়ে তার নৈতিক অবস্থান, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত চরিত্র প্রতিফলিত হয়।
জুলাই আন্দোলনের সেই কঠিন সময়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি বড় অংশ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কেউ সরাসরি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, কেউ নৈতিক সমর্থন জুগিয়েছেন, আবার কেউ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে নীরবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শহীদ মুগ্ধের স্মৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। শহীদ মুগ্ধের স্মরণে আয়োজিত প্রথম স্মরণসভায় তার পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উপস্থাপন করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল শহীদ মুগ্ধের স্মৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার আত্মত্যাগের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তীকালে এসব দাবির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করে এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্যোগ নেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৮ জুলাইকে ‘শহীদ মীর মুগ্ধ দিবস’ হিসেবে পালন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের নাম ‘শহীদ মীর মুগ্ধ তোরণ’ নামকরণের সিদ্ধান্ত এবং ‘জুলাই ’২৪ গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি কর্নার’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল একজন শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় দায়িত্ববোধকে আরো শক্তিশালী করা।
এছাড়া আন্তঃডিসিপ্লিন ফুটবল প্রতিযোগিতার নাম ‘শহীদ মীর মুগ্ধ আন্তঃডিসিপ্লিন ফুটবল প্রতিযোগিতা’ রাখা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে ‘মুগ্ধ ওয়াটার কর্নার’ স্থাপন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যিনি তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে পানি পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন, তার স্মৃতিকে পানির সঙ্গে যুক্ত করে সংরক্ষণ করা নিঃসন্দেহে এক গভীর মানবিক বার্তা বহন করে। এটি কেবল একটি প্রতীকী উদ্যোগ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সহমর্মিতা ও মানবসেবার এক জীবন্ত শিক্ষা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং তরুণ প্রজন্মের সম্পর্ককে নতুনভাবে উপলব্ধি করার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই অভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার কখনোই কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এগুলো মানুষের বিশ্বাস, সাহস এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়। এই উপলব্ধির অন্যতম ধারক ও বাহক ছিল বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, আর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে গর্বের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছে।
আজকের তরুণ প্রজন্মই আগামী বাংলাদেশের নির্মাতা। তাদের হাতে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব অর্পিত, যেখানে বৈষম্যের পরিবর্তে থাকবে ন্যায়, বিভেদের পরিবর্তে থাকবে সম্প্রীতি এবং ভয় ও নিপীড়নের পরিবর্তে থাকবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা। সেই বাংলাদেশ নির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা অপরিহার্য। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে সেই দায়িত্ব পালন করে যাবে—এটাই আমাদের অঙ্গীকার।
আমরা শহীদ মীর মুগ্ধসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। তাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে নতুন শক্তি দিয়েছে। তাদের স্মৃতি আমাদের অনুপ্রাণিত করবে সত্য, ন্যায় এবং মানবিকতার পথে অবিচল থাকতে। ইতিহাস তাদের আত্মত্যাগকে কখনো বিস্মৃত হবে না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই ইতিহাস আমাদের শুধু অতীত স্মরণ করিয়ে দেয় না; বরং ভবিষ্যতের প্রতি আমাদের দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে তখনই, যখন আমরা একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বাস করে, শিক্ষা, গবেষণা, মুক্তচিন্তা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই সেই অভিযাত্রা আরো সুদৃঢ় হবে। জ্ঞানচর্চা, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ নাগরিক গড়ে তোলার মাধ্যমে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় অতীতের মতো ভবিষ্যতেও দায়িত্বশীল অংশীদার হয়ে থাকবে।
লেখক : উপাচার্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


