জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কি শুধু নির্বাচন

মো. রাহেল ইসলাম

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কি শুধু নির্বাচন

জুলাই শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনীতি ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে জনগণের এক গভীর প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ, সাহস এবং অংশগ্রহণ সেই আন্দোলনকে একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মর্যাদা দিয়েছে। তাই আজ যখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু নির্বাচন, সরকার গঠন কিংবা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্থান পাচ্ছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কি সত্যিই শুধু নির্বাচন ছিল?

একটি রাষ্ট্রে যদি বিচারহীনতা, দুর্নীতি, প্রশাসনের দলীয়করণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং জবাবদিহির সংকট অক্ষত থাকে, তাহলে শুধু ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সেই রাষ্ট্রকে সত্যিকার গণতান্ত্রিক বলা যায় না।

বিজ্ঞাপন

জুলাইয়ের আন্দোলনে মানুষ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। তারা রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছিল। সেই অর্থে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন।

সংসদে কোনো দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেই ধরে নেওয়া যায় না যে দেশের সমগ্র জনগণ সেই দলের প্রতি পূর্ণ রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি আসনে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী বিজয়ী হন, যদিও তিনি মোট ভোটের অর্ধেকের কমও পেতে পারেন। ফলে জাতীয়ভাবে কোনো দল মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক বা তারও কম ভোট পেয়ে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি আসন লাভ করতে পারে। এটি আইনগতভাবে বৈধ হলেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।

এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং জনগণের পূর্ণ রাজনৈতিক সম্মতি এক বিষয় নয়। নির্বাচন সরকার গঠনের অধিকার দেয়, কিন্তু জনগণের সব আকাঙ্ক্ষার একচ্ছত্র প্রতিনিধি হওয়ার নৈতিক অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেয় না।

রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। বিচার বিভাগকে স্বাধীন হতে হবে, প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এসব প্রশ্ন যদি নির্বাচনের পর বিস্মৃত হয়, তাহলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে না।

অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের সুশাসন, জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা, কৃষক ও শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তা—এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু নির্বাচনি ইশতেহারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বাস্তবে প্রতিফলন ঘটতে হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নির্বাচনকে গণতন্ত্রের সূচনা হিসেবে দেখা, সমাপ্তি হিসেবে নয়। যদি নির্বাচনকে ব্যবহার করে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো নতুন রূপে ফিরে আসে, তাহলে গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আজ আমাদের প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকবে। সংসদ শক্তিশালী হবে, কিন্তু জনগণের ঊর্ধ্বে নয়। সরকার কার্যকর হবে। কিন্তু সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। সংবিধান সম্মানিত হবে, কিন্তু জনগণের ন্যায়সংগত প্রত্যাশার বিরুদ্ধে নয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন