প্রশ্নের মুখে নারীবাদ

প্রশ্নের মুখে নারীবাদ
প্রতীকী ছবি

নারীবাদও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। অনেক সময় বলা হয়, মূলধারার নারীবাদ শুধু সাদা মধ্যবিত্ত নারীর কথা বলে—এই কারণে বর্ণবাদ, শ্রেণিভেদ বা লিঙ্গবৈচিত্র্যের জায়গা পায় না। পোস্ট-ফেমিনিজম বলে, বর্তমান যুগে নারী এতটাই ক্ষমতাবান হয়েছে, আলাদা কোনো নারীবাদ দরকার নেই। রক্ষণশীল সমাজ বলে, নারীবাদ পারিবারিক কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। আবার অনেক সময় পশ্চিমা ফেমিনিজমকে ‘নব্য উপনিবেশবাদ’ হিসেবে দেখা হয়, কারণ তা তৃতীয় বিশ্বের নারীদের ‘বঞ্চিত’ বা ‘পিছিয়ে পড়া’ দেখিয়ে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করতে চায়।

ফলে, কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী, মুসলিম ও দরিদ্র নারীদের কণ্ঠস্বর অনেকটা গরহাজির আছে বলে মনে করা হয়। নারীবাদ একটি যাত্রার নাম, যা শুধু নারীর অধিকার আদায়ের লড়াই নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রয়াস। Feminism বারবার রূপ বদলেছে, প্রশ্ন তুলেছে এবং নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছে। নারীবাদ শুধু ইতিহাস নয়, এটি ভবিষ্যতেরও সন্ধান দেয়—একটি এমন সমাজের, যেখানে মানুষ হবেন মানুষ, লিঙ্গ নয় হবে পরিচয়ের একমাত্র মানদণ্ড। আসুন মূল আলাপে মশগুল হওয়ার আগে নাতিদীর্ঘ নারীবাদী সাহিত্যে রেমবিলিং করে আসি। এলেইন শোওয়াল্টার একজন প্রখ্যাত মার্কিন নারীবাদী সাহিত্য সমালোচক, যিনি নারীর অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে সাহিত্য বিশ্লেষণের একটি নতুন ধারা প্রবর্তন করেন, যাকে তিনি বলেন Gynocriticism। এটি নারীদের সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা, ভাষা, মানসিক গঠন ও সমাজে তাদের অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের লেখা বিশ্লেষণ করার একটি পদ্ধতি। Showalter মনে করেন, পুরুষতান্ত্রিক সাহিত্য সমালোচনা নারী লেখার প্রকৃত মান বুঝতে ব্যর্থ হয়। তাই নারী লেখকদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যের আলোকে মূল্যায়ন করাই gynocriticism-এর মূল উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপন

শোওয়াল্টারের সবচেয়ে বিখ্যাত বই A Literature of Their Own (1977)-এ তিনি ব্রিটিশ নারী ঔপন্যাসিকদের সাহিত্যিক অগ্রগতিকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেন : Feminine, Feminist এবং Female Phase। Feminine পর্বে নারীরা পুরুষদের লেখনীর কাঠামো অনুকরণ করেন, Feminist পর্বে তারা পুরুষতান্ত্রিক লেখার বিরোধিতা করেন আর Female পর্বে নারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ভাষায় স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে শুরু করেন। এই কাঠামোটি বিশ্বের নানা প্রান্তের নারীবাদী সাহিত্য বিশ্লেষণে একটি কার্যকর মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

শোওয়াল্টারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ The Female Malady (1985)-তে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ঊনবিংশ শতকে নারীদের মানসিক সমস্যা (যেমন ‘hysteria’) পুরুষতান্ত্রিক চিকিৎসা ও সাহিত্যিক বর্ণনায় একধরনের নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। তিনি নারীর মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ও সামাজিক বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। পরবর্তী বইগুলো, যেমন : Sexual Anarchy ও Hystories, আধুনিক সমাজে লিঙ্গ, যৌনতা এবং নারীর প্রতি সামাজিক প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। বাংলাদেশের সাহিত্য ও সমাজে Showalter-এর তত্ত্বগুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। যেমন : বেগম রোকেয়া সুলতানার স্বপ্ন একটি নারীবাদী ইউটোপিয়া, যা শোওয়াল্টারের Female Phase-এ বর্ণিত নারীর নিজস্ব কণ্ঠস্বরকে ধারণ করে। সেলিনা হোসেন যুদ্ধকালীন নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন হাঙর নদী গ্রেনেড-এ, যা gynocriticism-এর আলোকে বিশ্লেষণ করলে নারীর মনস্তত্ত্ব ও প্রতিরোধ স্পষ্ট হয়। এমনকি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইংরেজি সাহিত্যে শোওয়াল্টারের লেখাগুলো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত এবং গবেষণায় তার Gynocriticism পদ্ধতি ব্যবহার করে নারীর আত্মজৈবনিক রচনা, উপন্যাস ও কবিতা বিশ্লেষণ করা হয়। এটি নারী সাহিত্যিকদের আত্মপরিচয়, সামাজিক অবস্থান এবং ভাষার ব্যবহারকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ দেয়।

যদিও কিছু সমালোচক মনে করেন শোওয়াল্টার মূলত পশ্চিমা, শ্বেতাঙ্গ, মধ্যবিত্ত নারীর অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, তারপরও তার Gynocriticism তত্ত্ব উন্নয়নশীল দেশগুলোর নারীবাদী বিশ্লেষণে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়।

আর হেলেন সিক্সাস একজন প্রখ্যাত ফরাসি নারীবাদী তাত্ত্বিক ও দার্শনিক, যিনি নারীর ভাষা ও লেখার নতুন রূপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার সবচেয়ে পরিচিত ধারণা হলো écriture féminine, যা নারীর নিজস্ব লেখনভঙ্গি বোঝায়। সিক্সাস বলেন, নারীদের উচিত নিজেদের অভিজ্ঞতা, শরীর ও অনুভূতিকে কেন্দ্র করে লেখা, পুরুষতান্ত্রিক ভাষার বাইরের একটি মুক্ত, আবেগময় ও প্রবাহময় ভাষা তৈরি করা। তার বিখ্যাত প্রবন্ধ The Laugh of the Medusa-তে তিনি নারীদের আহ্বান জানান, যেন তারা সাহসী হয়ে নিজেদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে। এই তত্ত্ব পুরো দুনিয়ার নারী লেখিকাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ তারা প্রথাগত সামাজিক কাঠামো ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে নিজেদের জীবনের বেদনা, আশা ও সংগ্রামের কথা সাহিত্যে তুলে ধরেছেন।

এদিকে নরওয়েজিয়ান নারীবাদী তাত্ত্বিক টরিল মোই নারীবাদী সমালোচনার ভিন্ন ভিন্ন ধারাকে শ্রেণিবদ্ধ ও বিশ্লেষণ করেছেন। তার বই Sexual/Textual Politics-এ তিনি মূলত দুই ধরনের নারীবাদকে আলাদা করেছেন—Anglo-American feminism এবং French feminism। যেখানে Anglo-American feminism নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসকে গুরুত্ব দেয়, French feminism ভাষা ও লিঙ্গের মনস্তাত্ত্বিক ও দর্শনীয় দিক বিশ্লেষণ করে। মোই এর ধারণা অনুসারে নারীত্ব সামাজিকভাবে নির্মিত একটি পরিচয়, যা ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে। এই তত্ত্ব নারী লেখকদের কাজ ও নারীর সামাজিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে নারীকে ঘিরে অনেক সামাজিক বিধিনিষেধ এবং সংজ্ঞা রয়েছে যা পরিবর্তনের জন্য তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন। নারী লেখিকাদের লেখায় হেলেন সিক্সাসের écriture féminine-এর ছোঁয়া পাওয়া যায় স্পষ্টভাবে। অন্যদিকে টরিল মোইয়ের দর্শন অনুসারে, নারীরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধার মধ্য দিয়ে নিজেদের পরিচয় তৈরি করছেন, যা এক ধরনের সামাজিক নির্মাণ। এখনকার নারীবাদী লেখালেখি তাই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হলেও একই সঙ্গে ভাষার এবং দর্শনের নতুন দিকও উন্মোচিত করছে।

সার্বিকভাবে, হেলেন সিক্সাস ও টরিল মোইয়ের নারীবাদী তত্ত্ব নারী লেখালেখি এবং নারীর অবস্থান বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই তত্ত্বগুলো নারী লেখকদের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন ও মুক্তির জন্য একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি সরবরাহ করে, যা সমাজে নারীর অধিকারের জন্য লড়াইকে আরো শক্তিশালী করে। তাদের চিন্তা ও সমালোচনা নারীর কণ্ঠস্বরকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়।

বাংলাদেশে নারীবাদ অনেকটা সুশীল সমাজ, এনজিও এবং লেখক-পাঠকদের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে এনজিও এবং দাতা সংস্থার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলেও, অনেক সময় সেগুলো পশ্চিমা নারীবাদ কপি করায় সামাজিক ও ধর্মীয় সংঘাত তৈরি করেছে। গ্রামীণ ব্যাংক, বাঁচাও আন্দোলন, কিশোরী স্বাস্থ্য কর্মসূচি এসব কিছু নারীবাদী চেতনার অংশ হলেও তা প্রায়ই ‘ফান্ডিংনির্ভর উন্নয়ন তত্ত্ব’ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশে নারীবাদ এখনো শহুরে উচ্চবিত্ত বা শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দরিদ্র নারী, গ্রামীণ গৃহিণী, হিজড়া বা যৌনকর্মীদের অভিজ্ঞতা নারীবাদে খুব কমই প্রতিফলিত হয়। নারীবাদ অনেক সময় ধর্ম ও সংস্কৃতিকে অপমান করে এমন ধারণা প্রচার করে বলে সাধারণ মানুষ এটিকে ‘বিপজ্জনক’ বা ‘অপশক্তি’ বলে গণ্য করে। আবার, নারীবাদ নিয়ে ভুল ধারণা বা স্টেরিওটাইপও তৈরি হয়েছে—যেখানে নারীবাদকে পুরুষবিরোধিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

যাই হোক, পশ্চিমায়ন (Westernisation) নারীবাদের জন্য আসলেই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অনেক সমালোচক মনে করেন, আমি নিজেও তাই মনে করি। যেমন : চন্দ্র তালপাদে মোহান্তি, গায়ত্রী স্পিকাভ জানান, পশ্চিমা নারীবাদের ধারণা গ্লোবাল সাউথ-এ নমুনা কেটে বসে নাও। বাংলাদেশে নারীবাদের আদর্শ জনসাধারণের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারলেই তা সফল হবে। শ্রেণি ও সাংস্কৃতিক চোষা নারীবাদ যখন মধ্যবিত্ত বা শহুরে অভিজাতদের দাবি হয়ে দাঁড়ায়, তখন marginalized rural ও নতুন গৃহিণী নারীদের কণ্ঠস্বর মুছে যায়। এই সমালোচনা intersectional feminism-এর মূল দৃষ্টিকোণ। মানে সব নারী এক নয়। তাদের সমস্যাও এক নয়। নারীর মুক্তি চাইলে, তার পরিচয়ের সব স্তরকে বুঝে সমাধান খুঁজতে হবে, নারী যে বঞ্চনার শিকার হয়, তা শুধু লিঙ্গের কারণে নয়, বরং জাতি, শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ, শারীরিক সক্ষমতা, যৌনতা, ভাষা ও সংস্কৃতি ইত্যাদির কারণে।

মিডিয়া ও মার্কেটাইজেশন, ফেমিনিজম ব্র্যান্ডিং সাংস্কৃতিক পণ্যে সীমাবদ্ধ হলে এর আদর্শ এবং রাজনৈতিক চেতনা দুর্বল হয়। স্কুল ভেন্যু থেকে কলেজপর্যায়ে নারীবাদী ওয়ার্কশপ হলেও যদি কাঠামোগত সংস্কার না হয়, তাহলে আন্দোলনের মতোই শক্তি হারায়। পশ্চিমা নারীবাদ অনেক সময় ‘তৃতীয় বিশ্বের নারী’কে একক, দুর্বল, নির্যাতিত রূপে উপস্থাপন করেছে—যেন তারা সবসময়ই নিপীড়িত এবং বাঁচানোর জন্য অপেক্ষমাণ। মোহান্তি তার প্রবন্ধ ‘Under Western Eyes’-এ বলেন, পশ্চিমা নারীবাদীরা উন্নয়নশীল দেশের নারীদের অভিজ্ঞতা না বুঝে তাদের নিয়ে ধারণা তৈরি করে, যা জ্ঞানগত উপনিবেশবাদের (epistemic colonialism) উদাহরণ বৈকি। প্রথাগত নারীবাদ বহু সময় মধ্যবিত্ত, শ্বেতাঙ্গ, শহুরে নারীদের অভিজ্ঞতাকেই নারীর অভিজ্ঞতা হিসাবে সাধারণীকরণ করে।

কিম্বারলে ক্রেনশ একজন আফ্রিকান-আমেরিকান আইনজ্ঞ ও স্কলার, ১৯৮৯ সালে ‘intersectionality’ শব্দটি তৈরি করেন। তিনি দেখান, কৃষ্ণাঙ্গ, দরিদ্র ও মুসলিম নারীরা যেমন লিঙ্গ ও বর্ণ—উভয় কারণে বৈষম্যের শিকার হন, যা শুধু নারীবাদ বা বর্ণবাদ একা ব্যাখ্যা করতে পারে না। এই জটিল পরিচয়গুলো বিবেচনায় না আনলে নারীবাদ অসম্পূর্ণ হয়। বেল হুক্স—আসল নাম গ্লোরিয়া জিন ওয়াটকিন্স—একজন প্রভাবশালী আফ্রিকান-আমেরিকান লেখিকা, ফেমিনিস্ট, শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, নারীবাদ যদি ধনী নারীর ক্ষমতার উৎস হয়ে দাঁড়ায় অথচ গৃহকর্মী নারীর দুঃখ ভুলে যায়, তবে সেটি প্রকৃত নারীবাদ নয়। তিনি আরো বলেন, পিতৃতন্ত্র শুধু নারীকে নয়, পুরুষকেও সীমাবদ্ধ করে। অর্থাৎ, ছেলেদের শেখানো হয় শক্ত হতে, কাঁদতে না, নারীর ওপর কর্তৃত্ব রাখতে—যা অমানবিক ও ক্ষতিকর।

আজকের করপোরেট ও মিডিয়া সংস্কৃতিতে নারীবাদ ‘Girl Power’, ‘Boss Babe’, বা ‘Feminist T-shirt’-এর মাধ্যমে পণ্য হয়ে উঠেছে। নারীবাদের এই মার্কেট সংস্করণ মূল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যায়—যেমন গৃহস্থালি শ্রমের মূল্য, নারীর নিরাপত্তা বা শ্রমজীবী নারীর অধিকার।

সাবা মাহমুদ ও লেইলা আহমেদ মুসলিম সমাজে নারীর ভূমিকা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ফেমিনিজম প্রায়ই পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ (secular) ধারণা দিয়ে বিচার করে। সাবা মাহমুদ তার ‘Politics of Piety’ গ্রন্থে বলেন, মুসলিম নারীদের ধর্মীয় অনুশীলন বা পর্দা পালনকে আধুনিক নারীবাদ প্রায়ই ভুলভাবে ‘অপমানজনক’ মনে করে অথচ এটি নারীর নিজের ইচ্ছারও বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। তাই দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে একটি

ইসলামিক ফেমিনিজমের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।

আর নারীবাদ Misogyny-এর কথা বলতে গিয়ে Misandry করছে বলে অভিযোগও নেহাত কম নয়। কিছু উগ্র নারীবাদী গোষ্ঠী বা বক্তা পুরুষদের সমগ্রতাকে শত্রু বা দমনকারী হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলেন, যা Misandry—অর্থাৎ পুরুষবিদ্বেষের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। এর ফলে অনেকেই নারীবাদকে ভুল বুঝে এটিকে পুরুষবিরোধী আন্দোলন বলে ভুল ব্যাখ্যা করে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় বলা হয়, নারীবাদ বাস্তবতার চেয়ে বেশি ‘টকশোভিত্তিক’ হয়ে পড়েছে। কিছু নারীবাদী বয়ানে দেখা যায়—নারীরা যেন চিরকাল ‘ভিকটিম’ বা ‘শিকার’—এমন অবস্থানে অবস্থান করছে। এতে নারীর এজেন্সি বা নিজের ক্ষমতা অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। আধুনিক ‘ফেমিনিজম’ কখনো কখনো আলোচনার বদলে চাপিয়ে দেওয়া আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। যদি কেউ নারীবাদের কোনো দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তাকে ‘sexist’ বা ‘misogynist’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়—এতে মুক্ত আলোচনার পরিবেশ কমে যায়। কিছু নারীবাদী রচনায় দেখা যায়, পরিবার, বিয়ে, মাতৃত্ব—এসবকে পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক ফাঁদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও অনেক নারী এ ব্যবস্থার মধ্য থেকেই সুখী জীবনযাপন করে।

আখেরে বলব, নারীবাদের উদ্দেশ্য মহৎ—সমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু একপাক্ষিকতা, শ্রেণি-নির্বিশেষে কণ্ঠস্বর না শোনা বা উগ্র মতবাদ গ্রহণ করলে তা বিচ্ছিন্নতা, বিভাজন ও ভুল ব্যাখ্যার জন্ম দেয়। তাই আজকের নারীবাদ হওয়া উচিত সমন্বিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্লেষণধর্মী। বাংলাদেশের মতো সমাজে পশ্চিমা নারীবাদের অনেক ধারণা প্রাসঙ্গিক নয়। যেমন : শুধুই পোশাক, ডেটিং বা শরীরচর্চা নিয়ে নারীবাদী আন্দোলন তৃতীয় বিশ্বের শ্রমজীবী, দরিদ্র, গৃহকর্ত্রী নারীদের সমস্যাকে উপেক্ষা করে ফেলে। তাই বাংলাদেশি নারীবাদ হতে হবে স্থানীয় বাস্তবতা, ধর্মীয় বিশ্বাস, শ্রেণি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

যোগাযোগ : sahidkamrul25@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন