জুলাইয়ের শুরুটা ছিল রাজপথ অবরোধ আর স্লোগানে মুখর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিলেন। দেয়ালে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিল—যোগ্যতাই হোক মেধার একমাত্র মাপকাঠি। কিন্তু রাষ্ট্র সেই শান্তিকামী কণ্ঠস্বরকে দমাতে বেছে নিল দমন-পীড়ন। মধ্য জুলাইয়ে শাসকগোষ্ঠীর অহংকারী ও উসকানিমূলক মন্তব্য শান্ত আন্দোলনকে রূপ দিল এক তীব্র দাবানলে।
১৬ জুলাই দুপুরের পর পুরো বাংলাদেশের মনস্তত্ত্ব চিরতরে বদলে গেল। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে দুই হাত প্রসারিত করে, বুক চিতিয়ে পুলিশের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন আবু সাঈদ। সেই বুক লক্ষ্য করে ছোড়া হলো গুলি, লুটিয়ে পড়লেন সাঈদ। এই একটি দৃশ্য বাংলাদেশের কোটি মানুষের ভেতরের সুপ্ত ভয়কে নিমেষেই উধাও করে দিল। সাঈদের সেই প্রসারিত দুই হাত হয়ে উঠল দ্রোহের প্রতীক। এই দৃশ্য এবং সারা দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের দৃশ্য দেখে আমি আর নিজেকে ঘরের মাঝে আটকে রাখতে পারিনি। ১৭ জুলাই সকালেই বাসার সবার নিষেধ অমান্য করে বের হই রাজপথে। যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া যেন ছিল এক রণক্ষেত্র। চারদিক গুলি, সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ এবং কিছুক্ষণ পরপর সামনে এসে পড়ছে টিয়ারগ্যাস। পুলিশের বন্দুকের সামনে এভাবে বুক পেতে আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিতের ঘটনাটি আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করেছে। এরপর একে একে মীর মুগ্ধ (যার শেষ কথা ছিল—‘পানি লাগবে কারো, পানি?’), ফারহান ফাইয়াজ, ইয়ামিনদের মতো শত শত তরুণের রক্তে রঞ্জিত হলো দেশের রাজপথ। ১৮ জুলাই ছাত্রলীগের বাহিনীর সামনে আমি একা পড়ে যাই, যাদের মধ্যে বিন্দু পরিমাণও মনুষ্যত্ব ছিল না। ভেবেছিলাম হয়তো আমি নারী, আমাকে তারা রাস্তায় একা পেয়ে হেনস্তা করবে না, তবে তারা তো মনুষ্যত্ব আগেই হারিয়ে ফেলেছিল। তাদের আঘাতে বেশ ভালো আহত হই। আহত হয়েও আমি ঘরে বসে থাকতে পারিনি।
প্রতিদিনই বাসার কথা অমান্য করে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি। এরপর ১৯ জুলাই শুক্রবার। জুমার পর আমি যখন আমার সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগ করি রাজপথে বের হওয়ার জন্য, তখন তারা আমাকে বলে আজকে রাজপথ ছাত্রলীগ এবং পুলিশ বাহিনীর দখলে, তুমি মেয়ে মানুষ বের হওয়ার দরকার নেই। কেন জানি না তাদের এই কথা মানতে পারিনি। সবার কথা অমান্য করেই বের হয়েছিলাম। সে সময় পুলিশ এবং ছাত্রলীগ বাড়ির ছাদে উঠে ছাত্রদের ওপর গুলি ছুড়ছিল। চোখের সামনে একটার পর একটা লাশ যখন পড়ছিল, আমি তখন নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঠিক সে সময় একজন অপরিচিত ভাই আমার হাত ধরে আমাকে ধাক্কা দিয়ে পেছনে সরায় আর আরেকটা অপরিচিত ভাই আমার পাশে ছিলেন তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকিয়ে দেখি তার ঠিক কপালের মাঝ বরাবর একটি গুলি এসে লাগে। রক্তে পুরো রাস্তা রঞ্জিত। আমি তখন পুরো স্তব্ধ। যখন নিঃশ্বাস আটকে আসছিল, সে সময় আরেকজন আপু আর ভাইয়া আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে একটি বাসার নিচতলায় আশ্রয় নেন। আমি তখনো বুঝতে পারিনি এতক্ষণ কী হচ্ছিল আমার সামনে। এরপর সেদিন আবার আহত হয়ে বাসায় ফিরি। এভাবে দিনের পর দিন বেশ কয়েকবার আহত হয়ে যখন ভেতর থেকে শক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছিল, তখন ছাত্রছাত্রীদের ওপর সেই অমানবিক নির্যাতনের দৃশ্য বারবার সামনে আসছিল, যা দেখে কোনো মানুষেরই স্থির হয়ে থাকা সম্ভব নয়।
দিনটি ছিল ৪ আগস্ট। সারা দেশের পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। সেদিন সারা দিন বেশ কয়েকবার পুলিশের বাড়িতে নিজেকে আহত করেছি। সময়টি ছিল আসরের পর। যাত্রাবাড়ী, কুতুবখালীর সামনেই রসুলপুর আবাসিক ১ নম্বর গেটের সামনে পুলিশ বাহিনী ছাত্রদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তা দেখে আমরা কয়েকজন নারী মিছিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। আমাদের ধারণা ছিল পুলিশ হয়তো আমাদের ওপর গুলি ছুড়বে না। কিন্তু আমাদের ভাবনা ভুল করে পুলিশ আমাদের ওপরই গুলি ছুড়তে থাকে। পেছনে সরার মতো পরিস্থিতি ছিল না। একটা-দুটা করতে করতে ঠিক গুনে গুনে ছয়টি গুলি এসে লাগে আমার শরীরে।
জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কোটা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের রায় দিলেও, ততক্ষণে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। শত শত ছাত্র-জনতার রক্ত গড়িয়ে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষ আর কোটা সংস্কারের ফয়সালায় সন্তুষ্ট ছিল না। জুলাই মাসের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামই আগস্টের শুরুতে ‘এক দফা’—অর্থাৎ সরকারের পদত্যাগ দাবিতে রূপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে এবং এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সফল হয়।
২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে যেমন গভীর শোক আর বেদনার, তেমনি তা অসীম সাহসিকতা আর বিজয়ের নতুন সূর্যোদয়ের মাস। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন, ফাইয়াজসহ নাম না জানা শত শত বীর শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ এক নতুন দিগন্তে পদার্পণ করেছে। এই আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়। জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং ন্যায়ভিত্তিক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ে তোলাই হোক এই প্রজন্মের প্রধান অঙ্গীকার। শহীদদের আত্মত্যাগ তখনই সার্থক হবে, যখন দেশ থেকে সব ধরনের জুলুম ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে।
লেখক : প্রাক্তন শিক্ষার্থী, সরকারি আদমজী নগর এম ডব্লিউ কলেজ, নারায়ণগঞ্জ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

