২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার দাবিতে শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। শুরুতে এটি ছিল শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। কিন্তু আন্দোলন দমাতে তৎকালীন সরকার বলপ্রয়োগ করে। শুরু হয় দমন-পীড়ন, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনা। পরে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। চট্টগ্রাম ছিল এই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষ, অভিভাবক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
কোটা সংস্কার দাবিতে চট্টগ্রাম
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই চট্টগ্রামে কোটা সংস্কারের দাবিতে কর্মসূচি পালন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এতে অংশ নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ, ওমরগনি এমইএস কলেজ, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজ, বিভিন্ন বেসরকারি কলেজ ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, মামলা ও দমন-পীড়নের অভিযোগ সামনে আসতে থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে যুক্ত হন বিভিন্ন পেশার মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মী সমর্থকরা।
চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ১৬ জুলাই। ওইদিন নগরের মুরাদপুর মোড়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দমাতে পুলিশ অভিযান চালায়। পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনি, আরশাদুল আলম বাচ্চু, যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরীর বাবর ও লালখান বাজারের আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম, ওমরগনি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সল আহমেদ শান্ত ও পথচারী ফার্নিচারকর্মী মো. ফারুক নিহত হন। আহত হন শতাধিক মানুষ। ওই দিনের রক্তপাত পুরো চট্টগ্রামকে নাড়িয়ে দেয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন সাধারণ মানুষ। আন্দোলন তখন আর শুধু কোটা সংস্কার দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে তা ফ্যাসিস্ট সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জন-প্রতিরোধে রূপ নেয়। এরপর ১৭ জুলাই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সময়ে হাজার হাজার মানুষকে আসামি করে একাধিক মামলা করা হয়। শুরু হয় বাসা-বাড়ি ও বিভিন্ন এলাকায় গণগ্রেপ্তার। তবে এসব দমন-পীড়নেও আন্দোলনের গতি থেমে থাকেনি। বরং আন্দোলন আরো বেগবান হয়। শিক্ষার্থীরা নগরের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে সংগঠিত হতে থাকেন। আন্দোলনও আরো জোরালো হতে থাকে। রাত হলেও অনেকেই বাসায় ফিরতে পারতেন না। আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক নেতারা নিরাপত্তার কারণে বিভিন্ন স্থানে রাত কাটাতেন। সবার চোখ ছিল টেলিভিশনের পর্দায়। অপেক্ষা ছিল পরিস্থিতির নতুন মোড় নেওয়ার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, সবার
মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, কখন ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের ঘণ্টা বাজবে।
১৮ জুলাই সারা দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালিত হয়। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও, জিইসি, মুরাদপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তেই এসব এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেন। ওইদিনের সংঘর্ষে আরো প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ হন বহু মানুষ। আহত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। একই দিন নিউ মার্কেট, জামাল খান ও আন্দরকিল্লা এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পুলিশের গাড়িতে তুলে নেওয়ার ঘটনাও দেখা যায়। চট্টগ্রামের কয়েকটি পত্রিকার কিছু সাংবাদিক সে সময় সরকারের পক্ষে ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে দেখা গেছে।
১৯ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে কারফিউ জারি করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল ইন্টারনেট। মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী ও বিজিবি। শহরের প্রধান সড়কগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ে। সন্ধ্যার পর নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে কারফিউর মধ্যেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। দেয়াললিখন ও গোপন সাংগঠনিক কার্যক্রমও চলতে থাকে। ইন্টারনেট সীমিত থাকলেও বিভিন্ন মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন শিক্ষার্থীরা। সুযোগ পেলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টিকটক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আন্দোলনের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিল তারা।
২০ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত সময়জুড়ে চট্টগ্রামে চলে ব্যাপক ধরপাকড় ও ‘ব্লক রেইড’। গভীর রাতে শিক্ষার্থীদের বাসা, মেস ও কটেজে অভিযান চালিয়ে বহু শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষকে আটক করা হয়। আন্দোলন দমনে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে তোলে। একই সময়ে শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাতে শুরু করেন।
আগস্টের শুরুতে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। ১ আগস্ট থেকে চট্টগ্রামে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ২ আগস্ট জুমার নামাজের পর আন্দরকিল্লা থেকে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার বিশাল গণমিছিল বের হয়। প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে নিউ মার্কেট, কোতোয়ালি, টাইগারপাস ও ওয়াসা মোড় এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন তখন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
৩ আগস্ট নিউ মার্কেট এলাকায় স্মরণকালের অন্যতম বড় ছাত্র-জনতার সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে সরকারের পদত্যাগের 'এক দফা' দাবি ঘোষণা করা হয়।
আন্দোলন তখন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান এবং অনেক স্থানে ছাত্র-জনতার কর্মসূচিতে অংশ নেন। ফলে আন্দোলন একটি সর্বজনীন গণঅভ্যুত্থানের রূপ লাভ করে।
৪ আগস্ট চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট, কোতোয়ালি, মুরাদপুর, ষোলশহর ও আশপাশের এলাকা আবার সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার, গুলিবর্ষণ এবং পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় শতাধিক মানুষ আহত হন। আহতদের বড় একটি অংশকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে আহতদের মধ্যে কয়েকজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন সকাল থেকেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র-জনতা, শ্রমিক, রিকশাচালক, ব্যবসায়ী, অভিভাবক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা রাজপথে নেমে আসেন। নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দুপুরের পর শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রামজুড়ে শুরু হয় বিজয়ের উল্লাস। বিভিন্ন সড়কে আনন্দ মিছিল বের হয় এবং মানুষ একে অন্যকে অভিনন্দন জানান। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকার পতনের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নেয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক খসড়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৩ জন শহীদ হন এবং ১ হাজার ৭৩৮ জনের বেশি মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম, ফয়সল আহমেদ শান্ত, হৃদয় চন্দ্র তরুয়া, কাউসার মাহমুদ, মো. ফারুক, শহিদুল ইসলাম শহিদসহ অনেকে। তাদের আত্মত্যাগ আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জুলাই-আগস্টের সেই রক্তাক্ত দিনগুলো শুধু একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়। এটি ছাত্র-জনতার ঐক্যের প্রতীক। এটি গণমানুষের অংশগ্রহণেরও এক অনন্য উদাহরণ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। কোটা সংস্কার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এতে অংশ নেন। একপর্যায়ে আন্দোলন সর্বজনীন রূপ লাভ করে। তাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
লেখক : আবাসিক সম্পাদক, আমার দেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


