প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও জলাবদ্ধতার অভিশাপ কাটছে না চট্টগ্রামের। কাগজে-কলমে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ৯০ শতাংশ ছাড়ালেও বাস্তবে সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে বন্দরনগরী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমন্বয়হীনতা, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাই এ পরিস্থিতির মূল কারণ।
বন্দরনগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) আলাদা তিনটি প্রকল্পে প্রায় ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকার কাজ করছে। টাকার অঙ্কে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। তিন বছর মেয়াদের এসব প্রকল্পের আট বছর পার হয়ে গেছে। তবুও পরিস্থিতির উন্নতি নেই। এখনো সামান্য বৃষ্টিতেই ভাসে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম।
গত সপ্তাহে একদিনের ব্যবধানে দুই দফা বৃষ্টিতে নগরীর প্রবর্তক, আগ্রাবাদ, চকবাজার, পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। মঙ্গলবার দুপুরে মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে হাঁটুপানিতে নিমজ্জিত হয় প্রবর্তক, আগ্রাবাদ, চকবাজার, কাপাসগোলা, পাঁচলাইশ, মুরাদপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ছয় মিলিমিটার বৃষ্টির ফলাফল এই জলাবদ্ধতা। পরের তিন ঘণ্টায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। ছয় মিলিমিটার বৃষ্টিতে ডুবতে থাকা নগরী এই বৃষ্টিতে ভেসে যায়। তবে সাগরে ভাটা ও খালে দেওয়া বেশ কিছু বাঁধ অপসারণ করার কারণে রাতের মধ্যেই নেমে যায় জলাবদ্ধতার পানি। পরদিন বুধবার দুপুরে ফের বৃষ্টি শুরু হলে জলাবদ্ধতায় নাকাল হয় নগরবাসী।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় সংসদেও। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও দুঃখ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদে। আশ্বস্ত করেন যত দ্রুত সম্ভব চট্টগ্রামবাসীকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে কাজ করছে তার সরকার।
ভুক্তভোগীরা জানান, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার ধরন অন্য অঞ্চলের তুলনায় একটু আলাদা। পুরো নগরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৫৭টি খাল নদী ও সাগরে গিয়ে মিশেছে। এসব খাল দিয়েই বর্ষার পানি প্রবাহিত হয়। তবে নদী ও সাগরে জোয়ারের সময় বৃষ্টি হলে পানি নামতে পারে না। ভাটার সময় হলে বৃষ্টি থামার এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যে নেমে যায় পানি। কিন্তু এর আগেই সামান্য সময়ের জলাবদ্ধতা ভাসিয়ে নিয়ে যায় সবকিছু।
জলাবদ্ধতার এ অভিশাপ থেকে চট্টগ্রামবাসীকে মুক্তি দিতে ২০১৭ সালে সিডিএকে সাত হাজার কোটি টাকা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার আলাদা দুটি প্রকল্প দেয় সরকার। কিন্তু এত বছরেও তার ইতিবাচক কোনো প্রভাব দৃশ্যমান হয়নি।
জলাবদ্ধতার কারণ
নগরবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়া। বছরে উৎপাদিত প্রায় ১৯ লাখ টন বর্জ্যের বড় অংশই খাল-নদীতে গিয়ে পড়ছে, যা পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। এছাড়া পাহাড় কাটা ও বালু জমে খাল ভরাট হয়ে যাওয়াও বড় কারণ।
নগরবিদ স্থপতি আশিক ইমরান জানান, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকা। চট্টগ্রামে বছরে ১৯ লাখ টন বর্জ্য উৎপাদন হয়। এর ১০ লাখ টনই খালে ও নদীতে পড়ছে। দৈনিক এর পরিমাণ দুই হাজার ৭০০ টন বর্জ্য। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে খাল-বিল, নালা-নর্দমা-জলাশয় ও ডোবা এলাকা প্রতিদিন ভরাট হচ্ছে। ফলে বৃষ্টির পানি ধারণ করার মতো কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকছে না। এটিও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। আবার চট্টগ্রাম এলাকার পাহাড়গুলো বেশিরভাগই বালির পাহাড়। বৃষ্টিতে পাহাড়ের বালি ধুয়ে খালে এসে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তাই এক মৌসুমে একটি খাল খনন করলে পরের মৌসুম আসতে না আসতেই খালগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে সিটি করপোরেশন খাল পরিষ্কার করতে পুরোনো আমলের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। সিডিও এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্প শেষে সিটি করপোরেশনকে প্রকল্প বুঝিয়ে দিলেও বর্তমান সক্ষমতায় এত বড় এলাকার জলাবদ্ধতাসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সফলভাবে চালিয়ে নিতে পারবে না। এজন্য বাড়তি জনবলের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হবে চসিক কর্তৃপক্ষের।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক আখতার কবির জানান, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও নগরবাসীর বিরুদ্ধে খালে ময়লা ফেলাকে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু খালে ময়লা ফেলা বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মূলত চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা যতদিন থাকবে, একের পর এক প্রকল্প এনে লুটপাট করার সুযোগ ততদিনই থাকবে। তাই একে অন্যের ওপর চাপিয়ে দায় এড়িয়ে যাবে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিস্থিতি ভালো ছিল
নগর বিশেষজ্ঞরা জানান, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার সঙ্গে বন্দর, ওয়াসা, সিডিএ, সিটি করপোরেশন, পিডিবিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান জড়িত। একেকটি প্রতিষ্ঠান একেক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ। এখানে মেয়র বা সিডিএ চেয়ারম্যান ডাকলেই কেউ সেখানে যেতে বা সেই কাজ করতে বাধ্য নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই সমন্বয়হীনতা প্রকট আকার ধারণ করেছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চার উপদেষ্টাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প তদারকিতে। ফলে গত বছরে অন্য বছরের তুলনায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কম হয়েছিল। নতুন সরকার আসার পর আবার সেই সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
প্রকল্প হস্তান্তরের পর সংকট বাড়ার শঙ্কা
নগরবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার জানান, চট্টগ্রামের মোট ৫৭টি খালসহ নালা-নর্দমাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দেখাশোনা করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। কিন্তু এর মাঝে পতিত সরকার হঠাৎ করে সিডিএর মাধ্যমে সাত হাজার কোটি টাকার ৩৬টি খাল খননসহ বড় একটি প্রকল্প দিয়ে দেয় কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই। সিডিএর এমন কাজের অভিজ্ঞতা ও জনবল না থাকায় তারা এ প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেয়। কিন্তু চট্টগ্রাম শহরের কাজ ওয়াসা, পিডিবি, টিঅ্যান্ডটিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করা ছাড়া সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এসব সমন্বয় করতে গিয়ে তিন বছরের প্রকল্প আট বছরেও শেষ হয়নি। এর মাঝে প্রথমদিকে খনন করা খালগুলো ফের আবার ভরাট হয়ে গেছে। ফলে প্রকল্প সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের সময়ও নতুন জটিলতা তৈরি হবে। আবার সিটি করপোরেশন প্রকল্পটি বুঝে নিলেও সংকট দূর হবে না। কারণ, নতুন ও বর্ধিত এসব অবকাঠামো ঠিকমতো পরিচালনা বা রক্ষণাবেক্ষণের সঠিক প্রযুক্তি-জনবল কিছুই নেই। এর জন্য সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিভাগ পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে হবে।
বিষয়টি স্বীকার করে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, বর্তমান অবকাঠামোতে এত বড় প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা সিটি করপোরেশনের নেই। তবে সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য জনবল নিয়োগ, যন্ত্রাংশ কেনা ও বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অবগত করা হয়েছে। সেখান থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিষয়টির সুরাহা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে গত সপ্তাহে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নকাজ পরিদর্শনে আসেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো অভিজ্ঞতা সিডিএর ছিল না। পতিত সরকার অসৎ উদ্দেশ্যে একটি আনকোরা প্রতিষ্ঠানকে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

