চলতি অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই কন্টেইনার, বাল্ক ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর।
চলতি ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অন্তত ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে আশার কথা জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। অথচ চলতি বছরের প্রথম দুই মাস টানা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্দর-কাস্টমস শ্রমিক কর্মকর্তাদের আন্দোলনে ৯০ দিনের বেশি কার্যত অচল ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম। তারপরও ১৫ জুন পর্যন্ত ৩১ লাখ ৭১ হাজার ৭৭৯ টিইইউএস কন্টেইনার ১২ কোটি ৫০ লাখ টন বাল্ক কার্গো ও ৩ হাজার ৯০০ পণ্যবাহী জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল ৩১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৯০ টিইইউএস। বন্দর কর্তৃপক্ষের আশা বছর শেষে এবার সাড়ে ৩২ লাখ কন্টেইনারের পাশাপাশি ৪ হাজার ভিড়বে বন্দরে। লক্ষ্য বাস্তবায়ন হলে গেল বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।
বন্দর ব্যবহারকারীরা জানান, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের শুরুটা ছিল দুর্বিষহ। দেশের রাজনীতি তখন উত্তাল। ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে স্বৈরচার সরকারের পতনের দাবিতে শুরু হয় টানা আন্দোলন। জুলাই-আগস্ট দু’মাস-জুড়ে চলা এই আন্দোলনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমদানি-রপ্তানিতেও। এরপরেই সেপ্টেম্বর মাস-জুড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় দেখা দেয় আকস্মিক বন্যা। সব মিলিয়ে বছরের প্রথম তিন মাসে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতি। কিন্তু অক্টোবর থেকে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য গতি পায়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প খাত রপ্তানিতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখায় আমদানি-রপ্তানির গতিপথও স্বাভাবিক হতে থাকে। বছর শেষে গেল মে মাসের অর্ধেক সময়ের বেশি বন্দর ও কাস্টমসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের আন্দোলনে ফের স্থবিরতা তৈরি হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার অ্যান্ড মেরিন) ক্যাপ্টেন আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ জানান, প্রথম দিকে নানা সংকট থাকলেও অক্টোবর থেকে আমদানি-রপ্তানিতে গতি এসেছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকায় সবপক্ষ সমন্বয় করে কাজ করায় দুই মাসের বেশি সময় স্থবিরতা থাকলেও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা নষ্ট ভেঙ্গে পড়েনি। আমরা আশা করছি, এই অর্থ বছরেই বন্দর কার্যক্রমে নতুন রেকর্ড গড়তে পারবো।
শুধু মূল বন্দর নয়, কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড গড়েছে বন্দর সংশ্লিষ্ট ২১টি বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোগুলোও। বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার সেক্রেটারি রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব জানান, চলতি অর্থ বছরে ৬ লাখ ৮৮ হাজার রপ্তানি এবং ২ লাখ ৫৪ হাজার আমদানি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করেছে তারা। যা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ করেছে।
বিজিএমইএ’র সাবেক সহ সভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী জানান, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে বায়ারদের আস্থা বৃদ্ধি পায়। গত কয়েকমাসে তার প্রতিফলন হয়েছে। কিন্তু বছর শেষে বন্দর কাস্টমসের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মকর্তা কর্মচারীদের টানা কর্মবিরতিতে সেই আস্থার জায়গাটা নষ্ট হয়েছে। সরকারের উচিত যে কোন ধরনের আন্দোলন সংগ্রাম থেকে বন্দর কাস্টমসের মতো আমদানি রপ্তানি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। তাহলে বন্দরের এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় এনসিটি টার্মিনালের অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন জানান,কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতার ভিত্তিতে তৈরি বিশ্ব বন্দর ব্যবস্থাপনা লয়েড’স লিস্টের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৭ তম। গত বছরের চেয়ে এবার এক লাখ টিইইউএস বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিন মাসের স্থবিরতা না থাকলে এই সংখ্যা আরো বাড়ত। তারপরও লক্ষ্য পূরণ হলে আগামীতে এই তালিকায় আরো এগিয়ে আসবে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান।
এমএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

