শিল্পবর্জ্যে হুমকিতে বঙ্গোপসাগর, বিপন্ন সামুদ্রিক মাছ ও জীববৈচিত্র্য

শিল্পবর্জ্যে হুমকিতে বঙ্গোপসাগর, বিপন্ন সামুদ্রিক মাছ ও জীববৈচিত্র্য
শিল্পবর্জ্যে হুমকিতে বঙ্গোপসাগর, বিপন্ন সামুদ্রিক মাছ ও জীববৈচিত্র্য। ছবি: আমার দেশ

দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ডে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। বিভিন্ন শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, জাহাজভাঙা শিল্পের অবশিষ্টাংশ এবং উপকূলীয় এলাকার প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য সাগরে গিয়ে মিশে সামুদ্রিক মাছ, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন তারা।

পরিবেশবিদদের মতে, শিল্পায়ন দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামুদ্রিক সম্পদ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর। বিশেষ করে সীতাকুণ্ড উপকূলসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের পানিতে দূষণ বাড়তে থাকায় মাছের প্রজনন, ছোট মাছের বেঁচে থাকা এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর ও পরিবেশবিদ ড. মনজুরুল কিবরিয়া আমার দেশকে বলেন, শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন কারখানা, জাহাজভাঙা শিল্প এবং এলাকার প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের বর্জ্য সাগরে গিয়ে পড়ছে। এতে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক মাছ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন কেমিক্যাল ও বর্জ্যের কারণে সাগরের পানির স্বাভাবিক গুণগত মান পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর।

ড. মনজুরুল কিবরিয়া আরও বলেন, মাছ যখন সমুদ্রে ডিম ছাড়ে, তখন পানির ঢেউ ও স্রোতের কারণে অনেক ডিম উপকূলীয় এলাকায় চলে আসে। সেখানে ডিম থেকে বাচ্চা হওয়ার পর দূষিত পানি ও ক্ষতিকর উপাদানের কারণে অনেক ছোট মাছ মারা যায়। ফলে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যেসব মাছ দূষিত পরিবেশে বেঁচে থাকে, সেগুলো বড় হওয়ার পর মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, একসময় সীতাকুণ্ড উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় প্রচুর সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যেত। ভোরে জেলেদের নৌকা ফিরত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে। কিন্তু বর্তমানে অনেক সময় জাল ফেললে মাছের পরিবর্তে উঠে আসছে পলিথিন, প্লাস্টিক ও নানা ধরনের বর্জ্য। এতে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জেলেদের জীবন-জীবিকাও সংকটে পড়ছে।

জেলেদের অভিযোগ, শিল্পাঞ্চলের কিছু কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, অপরিশোধিত পানি, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং বিভিন্ন দূষণকারী উপাদান খাল-নালা হয়ে সাগরে গিয়ে মিশছে। এর পাশাপাশি জাহাজভাঙা শিল্পের কিছু বর্জ্যও সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে তারা দাবি করেন।

পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মো. সাইদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য ও প্লাস্টিক সমুদ্রের পানিতে গিয়ে সামুদ্রিক মাছ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের কারণ হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে হলে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান পরিবেশের ক্ষতি করে কেমিক্যাল বা বর্জ্য সাগরে ফেলছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কার্যকর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ ছাড়া সমুদ্র দূষণ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

পরিবেশবিদদের মতে, সীতাকুণ্ড উপকূল রক্ষায় শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) কার্যকর রাখা, নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং দূষণের উৎস শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তারা আরও বলেন, সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনগণ, জেলে সম্প্রদায় ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ ও ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সীতাকুণ্ড উপকূলের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং উপকূলনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।

তাদের মতে, উন্নয়ন ও শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বঙ্গোপসাগর শুধু একটি জলভাগ নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। তাই এই সম্পদ রক্ষায় এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন