চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর দুই নম্বর নেতা মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও পুলিশের হাত থেকে ঠিক তখনই ফসকে গেছেন বাহিনীর আরেক শীর্ষ নেতা, কিলিং স্কোয়াডের প্রধান রায়হান আলম। একই রাতে চালানো দুটি পৃথক অভিযানে একজনকে ধরা গেলেও আরেকজনকে অল্পের জন্য হাতছাড়া হওয়ায় বড় সাজ্জাদ বাহিনীর মূল কাঠামো ভাঙার সুযোগটি এবার পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারল না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এদিকে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে সাজ্জাদ আলী খান বলেন, চট্টগ্রামে তার নাম ব্যবহার করে একটি চক্র চাঁদাবাজি করছে। তিনি এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন। রায়হান আলম নামে কাউকে তিনি চেনেন না বলেও জানান তিনি। তার দাবি, তাকে জড়িয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো ভিত্তিহীন।
কয়েক দিন ধরে ডেভিড ইমনের অবস্থান শনাক্তে কাজ করছিল গোয়েন্দা পুলিশ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যশোরের বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়, বসানো হয় একাধিক চেকপোস্ট। মঙ্গলবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে যশোর কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকার একটি চেকপোস্টে সন্দেহভাজন চারজনকে থামিয়ে পরিচয় যাচাই করা হয়। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই গ্রেপ্তার করা হয় ডেভিড ইমনকে, তার সঙ্গে থাকা তিন সহযোগী আলিস তমাল, শাফায়াত ও শামীমকেও আটক করে পরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বুধবার বিকেলে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে ধরতে সক্ষম হয়েছে এবং গ্রেপ্তারের পর তাকে চট্টগ্রাম পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
একই রাতে ফসকে গেলেন রায়হান আলম
ডেভিড ইমন যখন যশোরে ধরা পড়ছেন, প্রায় একই সময়ে নোয়াখালীতে চালানো আরেকটি অভিযানে বাহিনীর কিলিং স্কোয়াড প্রধান রায়হান আলমকে ধরতে যায় পুলিশ। কিন্তু তিনি অল্পের জন্য এড়িয়ে যান। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, তারা রায়হানকে একটুর জন্য ধরতে পারেননি, তবে তিনি এখনো তাদের নজরদারির আওতায় আছেন এবং শিগগিরই তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রায়হান আলম ফসকে যাওয়াটা পুলিশের জন্য একটি বড় ধাক্কা। কারণ ডেভিড ইমনের পাশাপাশি তাকেও ধরতে পারলে বিদেশে পলাতক আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রধান হোতা সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের চট্টগ্রামের নেতৃত্বকাঠামোর দুই শীর্ষ ব্যক্তিই একসঙ্গে পুলিশের জালে ধরা পড়তেন। ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে এই দুজন ডেভিড ইমন ও রায়হান যৌথভাবে বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন বলে পুলিশের ভাষ্য।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই নাম
পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে চট্টগ্রামে ডেভিড ইমন নামে কাউকে চেনা যেত না। বড় সাজ্জাদের দলে যোগ দিয়ে একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে দ্রুতই তিনি সাজ্জাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং বর্তমানে সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে বাকলিয়ার জোড়া হত্যা, পতেঙ্গায় ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যাসহ একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের মামলা রয়েছে।
অন্যদিকে রায়হান আলম পরিচিত বাহিনীর কিলিং স্কোয়াড প্রধান হিসেবে। পুলিশের তথ্যমতে, তার নামে জোড়া খুনসহ একাধিক হত্যা মামলা আছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে রাউজানে যুবদলের মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ হত্যার ঘটনাতেও তার নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের এক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি করে ফোন করার অভিযোগ ওঠে ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে, যেখানে তিনি নিজের পরিচয় জানিয়ে হুমকি দেন বলে অভিযোগ। এরপরই তাকে গ্রেপ্তারে তৎপরতা জোরদার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেপ্তারের পর ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রামে এনে সংশ্লিষ্ট মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে জানা গেছে, পাশাপাশি আটক তিন সহযোগীর ভূমিকাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
তবে বাহিনীর দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি রায়হান আলম এখনো পলাতক থাকায়, চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে সাজ্জাদ বাহিনীর কার্যক্রম কতটা স্তব্ধ হবে। তা এখনই বলা যাচ্ছে না। পুলিশ বলছে, তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এদিকে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে সাজ্জাদ আলী খান বলেন, চট্টগ্রামে তার নাম ব্যবহার করে একটি চক্র চাঁদাবাজি করছে। তিনি এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন। রায়হান আলম নামে কাউকে তিনি চেনেন না বলেও জানান তিনি। তার দাবি, তাকে জড়িয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো ভিত্তিহীন।
ডেভিড ইমন ও রায়হান আলমের বিরুদ্ধে যত হত্যার অভিযোগ
ডেভিড ইমন এবং রায়হান আলমের নাম নগরের কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় এসেছে। বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া মামলা, বাদীপক্ষের অভিযোগ ও পুলিশের বক্তব্যে তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ রাতে চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকায় বখতিয়ার হোসেন (৩০) ও মোহাম্মদ আবদুল্লাহ (৩২) গুলিতে নিহত হন। তারা সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডে যাওয়ার পথে একটি প্রাইভেট কার লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। পাঁচটি মোটরসাইকেলে থাকা দুর্বৃত্তরা এ হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হয়। ওই গাড়িতে থাকা সরোয়ার হোসেন প্রাণে বেঁচে যান।
এই ঘটনায় নিহত বখতিয়ার ও আবদুল্লাহর পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলায় সাজ্জাদ আলী খান, তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্নাসহ মোহাম্মদ হাসান, মোবারক হোসেন ইমন (ডেভিড ইমন), খোরশেদ, রায়হান আলম ও বোরহানকে আসামি করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, এই হত্যাকাণ্ডে হামলাকারীদের সমন্বয় এবং মোটরসাইকেল ব্যবস্থাপনায় ডেভিড ইমনের ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে।
পতেঙ্গায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলায় নাম
২০২৫ সালের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় গুলিতে আহত হন আলী আকবর ওরফে ঢাকাইয়া আকবর (৪৪)। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন দর্শনার্থী জান্নাতুল বাকী ও শিশু মহিম ইসলাম রাতুল। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫ মে মারা যান আলী আকবর। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী রূপালী বেগম বাদী হয়ে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলায় সাজ্জাদ আলী খানের ভাই ওসমান আলী সেগুন ও ভাগনে আলভিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনের নামও রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রামে আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনায়ও ডেভিড ইমনের নাম আলোচনায় আসে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত হওয়ার পর ডেভিড ইমনের নাম ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে। তবে এই ঘটনায় তার ভূমিকার বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সর্বশেষ চলতি বছরের ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজার এলাকায় গুলিতে নিহত হন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক মাসুদ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দুবাইয়ে অবস্থানরত সাজ্জাদ আলী খানের নির্দেশে রায়হান বাহিনীর সদস্যরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ ঘটনায় রায়হান আলমের নামও আলোচনায় আসে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, চট্টগ্রামের অপরাধজগতের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-cbebd6.jpg)