বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, বিরোধী মত দমনের অভিযোগ এবং সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই এ গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে ত্যাগ, সাহস, আত্মত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও মানুষের ঐক্যের এক অনন্য অধ্যায়।
বুধবার (২৯ জুলাই) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শাখা ছাত্র শিবির আয়োজিত ‘জুলাইয়ের অদম্য ঐক্য এবং বিজয়ের ইতিহাস’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতে জাহিদুল ইসলাম বলেন, জুলাইকে একক কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এর ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংগঠনিক, আবেগিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিটি দিকই গভীরভাবে গবেষণার দাবি রাখে।
তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় যেমন একদিকে সংঘর্ষ, গুলি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের মধ্যে নামাজ, দোয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসার দৃশ্যও দেখা গেছে। এসব বিষয় জুলাইকে একটি ব্যতিক্রমধর্মী গণআন্দোলনে পরিণত করেছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পেছনে দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন ঘটনার ধারাবাহিকতা কাজ করেছে। বিরোধী মত দমন, গুম, গ্রেপ্তার, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, বিভিন্ন আন্দোলনে বলপ্রয়োগ এবং নাগরিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ তৈরি করেছিল।
জাহিদুল ইসলাম তার বক্তব্যে ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা, পিলখানা ট্র্যাজেডি, শাপলা চত্বরের অভিযান, কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এসব ঘটনার উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ বলে মন্তব্য করার পর আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে। ওই মন্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার’ স্লোগানটি প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়।
বক্তব্যে তিনি ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ওই ঘটনার পর বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও সামাজিক সংগঠনের মধ্যে প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের প্রভাব কমতে শুরু করলে আন্দোলনকারীদের মধ্যে সরকার পতনের বিষয়ে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় সাধারণ মানুষ আরও বেশি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে শুরু করেন এবং তা শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
বক্তব্যে তিনি আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ করে বলেন, জুলাইয়ের ইতিহাস শহীদদের আত্মত্যাগ ছাড়া কল্পনা করা যায় না। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনে আহত অনেক ব্যক্তি সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের পরিবারের ভোগান্তি এবং তাদের মানসিক কষ্টের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
তিনি আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন, শান্তসহ আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ করেন এবং বলেন, তাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন স্মরণ রাখবে। একই সঙ্গে তিনি নিহতদের পরিবারের ত্যাগ ও সংগ্রামের কথাও উল্লেখ করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ভয়মুক্ত পরিবেশের কথা উল্লেখ করে জাহিদুল ইসলাম বলেন, আজকের বাংলাদেশে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে আগের তুলনায় অনেক বেশি সাহসের সঙ্গে কথা বলতে পারছে। জনগণ ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন হয়েছে এবং অন্যায়কে সহজে মেনে নিচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের চেতনা শুধু স্মরণে রাখলেই হবে না; বরং ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই চেতনাকে বাস্তবায়ন করতে হবে।
আলোচনা সভায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

