প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা বাংলাদেশ। ঈদের টানা ছুটিকে সামনে রেখে ভ্রমণপিপাসুদের বরণে প্রস্তুত দেশের পর্যটন স্পটগুলো। সবুজ পাহাড়, নীল জলরাশি আর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউÑসব মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে এখন উৎসবের আমেজ। কেউ ছুটছেন পাহাড়ের টানে, কেউবা সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আবার অনেকে চা বাগানের স্নিগ্ধ সবুজে খুঁজছেন প্রশান্তি।
রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের একটি মনোরম রিসোর্ট, যা কাপ্তাই লেকের তীরে অবস্থিত। শান্ত পরিবেশ, হ্রদ দেখার বারান্দাসহ সুসজ্জিত কক্ষ এবং ভিউ রেস্তোরাঁর জন্য এটি পরিচিত। এখানে রয়েছে সানরাইজ ইকোপার্ক। এখানে আদিবাসী ঘরানার কটেজ, হানিমুন কটেজ এবং সুইট রুমের সুবিধা রয়েছে, যার ভাড়া সাধারণত দুই থেকে সাত হাজার টাকার মধ্যে।
এই হলিডে কমপ্লেক্সের ম্যানেজার অলক বিকাশ চাকমা আমার দেশকে জানান, এবার ঈদ উপলক্ষে আগামী ২২ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের শতকরা ৮০ ভাগ রুম বুক হয়ে গেছে। এবার ঈদের দিন আগত ভ্রমণার্থীদের ফুল দিয়ে বরণ করা হবে। খাবারেও থাকবে বৈচিত্র্য। ঈদের দিন পর্যটকদের জন্য থাকবে ফিরনি, পায়েস, পোলাও, রোস্ট-রেজালার পাশাপাশি পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী খাবার। থাকবে নানা ধরনের পিঠা, পাচন ইত্যাদি। তিনি পর্যটন খাতের পক্ষ থেকে সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান।
কাপ্তাইয়ের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে গিয়ে দেখা গেছে, ঈদ সামনে রেখে নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে স্পটগুলো। কাপ্তাইয়ের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র শিলছড়ি নিসর্গ রিভার ভ্যালি অ্যান্ড পড হাউসে গিয়ে দেখা গেছে, এখানে নতুন করে সাজানো হচ্ছে তাদের নিসর্গ রেস্টুরেন্ট।
নিসর্গ রিভার ভ্যালির ম্যানেজার মিনহাজ উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, আমাদের ৯টি নন-এসি পড হাউস, পাঁচটি এসি পড হাউস এবং পাঁচটি ডিলাক্স রুম ঈদের দিন হতে আগামী ২৭ মার্চ পর্যন্ত বুকিং হয়ে গেছে। আমাদের খাবার রেস্টুরেন্টে একসঙ্গে তিন শতাধিক লোক খেতে পারেন।
ওয়াগ্গা ৪১ বিজিবি পরিচালিত প্যানোরোমা জুম রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখা গেছে, এখানেও নান্দনিক রূপে সাজানো হচ্ছে পর্যটন স্পটটি।
কক্সবাজার, যেখানে ঘুরতে পারেন পর্যটকরা
দেশের পর্যটন রাজধানী হিসেবে খ্যাত কক্সবাজার। এখানকার পর্যটন স্পটগুলোয় প্রতি বছর ৬০-৭০ লাখ মানুষ ভ্রমণ করেন। এবারের ঈদের ছুটিতেও ১০ লাখের বেশি মানুষের সমাবেশ ঘটবে বলে আশা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্টরা। এ জেলা শহরের প্রধান আকর্ষণ পৃথিবীর দীর্ঘতম বালুকাময় সমুদ্রসৈকত। সমুদ্রের লোনা পানির ডেউয়ের সঙ্গে মিতালি করতে ছুটে আসেন লাখো মানুষ। শুধু এখানকার সমুদ্র সৈকতই মানুষকে আকৃষ্ট করে না; এখানকার পাহাড়, দ্বীপ আর পর্যটকদের জন্য সাজানো নানা ধরনের স্পট তাদের টেনে আনে। আর সেসব মানুষকে স্বাগত জানাতে সব সময় প্রস্তুত থাকে পাঁচ শতাধিক আবাসিক হোটেল, মোটেল, গেস্ট হাউস ও রিসোর্ট।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত
কক্সবাজারে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম ১২০ কিলোমিটার লম্বা বালুকাময় সমুদ্রসৈকত। পর্যটক ও ভ্রমণপিপাসুরা সমুদ্রের গর্জন উপভোগ করতেই এখানে ছুটে আসেন। কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত এ সমুদ্রসৈকত। সমুদ্রের আকর্ষণে কক্সবাজারে সারা বছর পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। আর ঈদ সামনে রেখে এ সমাগম সবচেয়ে বেশি থাকে।
মেরিন ড্রাইভ
কক্সবাজারে রয়েছে সুদীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ। সড়কটি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। সড়কটির এক পাশে বিশাল সমুদ্র, অন্যপাশে পাহাড়ের সারি। এ সড়ক পর্যটকদের আকর্ষণের আরেক নাম। গাড়ি নিয়ে মেরিন ড্রাইভ হয়ে যাওয়া যায় টেকনাফ পর্যন্ত। যাওয়া-আসার পথে পাহাড় আর সমুদ্র মানুষকে আকৃষ্ট করে। খোলা জিপে এ সড়কে ভ্রমণ অনন্য ও মনোমুগ্ধকর।
ইনানি, হিমছড়ি, পাটুয়ারটেক সৈকত
কক্সবাজার শহরের সমুদ্রসৈকতের মূল পয়েন্ট ছাড়াও আরো বেশকিছু সৈকতের স্পট রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছেÑহিমছড়ি, ইনানি, সোনারপাড়া, পাটুয়ারটেক ও টেকনাফ সমুদ্রসৈকত। পর্যটকরা এসব স্পট ঘুরতে খুব পছন্দ করেন। প্রতিটি স্পটেই মেরিন ড্রাইভ হয়ে যেতে হয়।
ভিন্ন পর্যটন
সমুদ্রসৈকত ছাড়াও পর্যটকদের জন্য আরো বেশ কয়েকটি পর্যটন স্পট রয়েছে। সেগুলো হলোÑদ্বীপ উপজেলা মহেশখালী উপজেলার আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া সমুদ্রসৈকত, কুতুবদিয়ার বাতিঘর, চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, রামুর ঐতিহাসিক বৌদ্ধমন্দির, রামু রাবার বাগান, কক্সবাজার শহরের প্রতিষ্ঠাতা ক্যাপ্টেন কক্সের বাংলো, মিনি বন্দারবান আর টেকনাফের ঐতিহাসিক প্রেমের নিদর্শন মাথিনের কূপ, শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট।
ঈদের লম্বা ছুটিতে ঢল নামাবে সিলেটে
সিলেটের চা বাগান, পাহাড় ও স্বচ্ছ পানির ঝরনা উপভোগ করতে আসন্ন ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় বা ঢল নামার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত জাফলং, রাতারগুল, সাদাপাথর বিছনাকান্দি, মাধবকুণ্ড, শ্রীমঙ্গল এবং তাহিরপুরের শিমুল বাগান। পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি ও স্বচ্ছ পানির মেলবন্ধন এ অঞ্চলকে পর্যটকদের কাছে করেছে আকর্ষণীয়। অধিকাংশ পর্যটন কেন্দ্র সাজানো হয়েছে এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। হোটেল ও রিসোর্টগুলোর শতকরা ৬০-৭০ ভাগ বুকিং ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এবার জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে জনস্রোত কিছুটা কম হতে পারে বলে ধারণা করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদের ছুটিতে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে দেশজুড়ে ভ্রমণপ্রেমীদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ। ইতোমধ্যে শহরের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে আগাম বুকিংয়ের চাপ লক্ষ করা যাচ্ছে।
কার্নিভাল ক্রুজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু আজ
এদিকে, দেশীয় পর্যটনশিল্পের বিকাশে আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ব্যতিক্রমধর্মী নৌভ্রমণের আয়োজন করেছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাটসংলগ্ন ফেরিঘাট থেকে সকাল ১০টায় ইলিশার উদ্দেশে কার্নিভাল ক্রুজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। গতকাল বুধবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কার্নিভাল ক্রুজটি যাত্রীদের জন্য একটি ব্যতিক্রমধর্মী নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রদান করবে। এ ক্রুজে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, নিরাপদ ভ্রমণব্যবস্থা এবং বিনোদনের বিভিন্ন আয়োজন থাকবে, যা দেশীয় পর্যটনশিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হচ্ছে। আগ্রহী যাত্রীদের নির্ধারিত সময় উপস্থিত থেকে এ সেবা গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে নদীপথে ভ্রমণ আরো আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

