‘জীবন্ত ফার্মেসি’ সিআরবিতে ফের হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

‘জীবন্ত ফার্মেসি’ সিআরবিতে ফের হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ

চট্টগ্রামের সিআরবি—কংক্রিটে ঢেকে যাওয়া নগরীর ভেতরে যেন লুকানো এক বনভূমি। এই সবুজ আচ্ছাদনের উল্টো পিঠে জমে আছে এক বিস্ময়। দীর্ঘ চার মাসের গবেষণায় এখানকার বনজঙ্গলে পাওয়া গেছে ১৮৩ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ, যার অনেকগুলো ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, উচ্চরক্তচাপ, অর্শ, জন্ডিসসহ নানা জটিল অসুখের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। ফলে সিআরবি হয়ে উঠেছে ‘জীবন্ত ফার্মেসি’।

এই প্রাকৃতিক হাসপাতালের বুকে রেলপথ মন্ত্রণালয় আবারও ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘ বিতর্ক, আন্দোলন ও পরিবেশ রক্ষার দাবিতে প্রকল্পটি স্থগিত হওয়ার প্রায় চার বছর পর নতুন করে হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন দিতে চান বিএনপি সরকারের রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। আজ শনিবার চট্টগ্রামে আসছেন তিনি। আগামীকাল রোববার বিকাল ৪টায় প্রস্তাবিত হাসপাতালের জায়গাটি পরিদর্শন করবেন তিনি। পরিবেশবিদ ও গবেষকরা জানান, সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ হলে প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস হবে।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ চার মাসের গবেষণায় এ সিআরবিতে ১৮৩টি ঔষধি উদ্ভিদের অস্তিত্ব পেয়েছেন গবেষকরা। ২০২২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেলের নেতৃত্বে বেসরকারি সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো) এ গবেষণা করে। নগরীর ২০টি এলাকার গাছের ওপর গবেষণাটি করা হয়।

সিআরবির পাশে বাটালি পাহাড় ও মুরগির ফার্ম এলাকার গাছপালা দেখা শেষে গবেষকরা যখন সিআরবিতে আসেন, তারা বিস্মিত হন জঙ্গলের গভীরতা আর উদ্ভিদের বৈচিত্র্য দেখে। গবেষকরা জানান, চট্টগ্রামের অন্য যেকোনো এলাকার তুলনায় সিআরবি একটি আলাদা জগৎ।

গবেষক ওমর ফারুক রাসেল বলেন, সিআরবি এলাকায় শ্বাস নিলেই বোঝা যায়, এখানে এখনো প্রকৃতি টিকে আছে। আমরা ১৮৩টি ঔষধি গাছের সন্ধান পেয়েছি, যার পাতা, শিকড়, ফল, বাঁকল সবই ওষুধে ব্যবহার করা হয়। নগরজীবনে এমন বৈচিত্র্য কোথায় আছে? তার বক্তব্যে স্পষ্ট, সিআরবি কেবল সবুজ নয়, প্রকৃতিগতভাবে চিকিৎসার এক সমৃদ্ধ সম্ভার।

গবেষণায় দেখা গেছে, সিআরবিতে ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে গুল্ম ৩৪ প্রজাতি, লতা ২২ প্রজাতি, বিপন্ন ৯টি আর ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হতে পারে এমন ৬৬টি প্রজাতি রয়েছে। এলাকাটিতে আছে ৮৮টি বড় বৃক্ষ, যার অনেকটাই শতবর্ষী গর্জন ও শিরীষ। এসব বৃক্ষ শুধু ছায়াই দেয় না, নগরে বেঁচে থাকা জীববৈচিত্র্যের শেষ রক্ষাকবচও হয়ে আছে।

গবেষকরা যেসব ওষুধি গাছের সন্ধান পেয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছেÑটোনা, অর্জুন, লজ্জাবতী, আপাং, নিসিন্দা, টগর, শজনে, দেবকাঞ্চন, মাটমিন্দা, সর্পগন্ধা, বকুল, শিমুল, পিতরাজ, দুধকুরুস, সোনাতলা, দুরন্ত ইত্যাদি। প্রতিটি গাছের আলাদা গুণ। টোনার শিকড় ক্যানসারের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অর্জুন হৃদরোগ আর উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। লজ্জাবতীর পাতা, কাণ্ড, ফুলÑসবকিছুই ভেষজ। নিসিন্দা দাদ দূর করে, টগর জন্ডিসে কাজ দেয়, শজনের শিকড় থেকে ফল পর্যন্ত সবই ‘ম্যাজিক’। আপাং একই সঙ্গে টিউমার, দাঁতব্যথা, নিউমোনিয়া, কিডনিতে পাথরসহ বিভিন্ন রোগে ব্যবহৃত হয়।

চট্টগ্রামের নাগরিকদের কাছে সিআরবি তাই শুধু একটি পাহাড় নয় এটি স্মৃতি, ইতিহাস, প্রকৃতি আর সংস্কৃতির মিলনস্থল। ঠিক সে জায়গার ছয় একর জমিতে বেসরকারি একটি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য রেলওয়ে আবার চুক্তি করায় শহরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

রেলপথ মন্ত্রীর একান্ত সচিব হাবিবুল হাসান রুমির সই করা মন্ত্রীর সফরসূচিতে আজ রেলমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরে আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সফরসূচি অনুযায়ী আগামীকাল ১৯ এপ্রিল বিকাল ৪টায় তিনি সিআরবি-সংলগ্ন গোয়ালপাড়া এলাকায় প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থান পরিদর্শন করবেন।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার রেজাউল করিম সিদ্দিকী বলেন, ১৯ এপ্রিল বিকাল ৪টায় সিআরবির প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থান পরিদর্শন করবেন মন্ত্রী।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, সরেজমিন পরিদর্শনের পর সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণে নীতিগত অনুমোদন দেবেন মন্ত্রী। প্রস্তুতিও সে অনুযায়ী নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে সরাসরি অবস্থান জানাতে চাননি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সবুক্তগীন। সিআরবিতে হাসপাতাল পরিদর্শন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

‘প্রাকৃতিক হাসপাতাল’ সিআরবি

সরেজমিন দেখা গেছে, রাত গভীর হলে চট্টগ্রাম শহর যখন ধীরে ধীরে থেমে যায়, তখনো সিআরবি নিঃশব্দে জেগে থাকে একটি ভিন্ন জগৎ হিসেবে।

গাছের ফাঁক দিয়ে বাতাস নামে, দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়, আর শহরের ক্লান্ত মানুষগুলো এখানে এসে কিছু সময়ের স্বস্তি খুঁজে নেন। কেউ কাজ শেষে আসেন, কেউ আসেন নিঃসঙ্গতা কাটাতে, আবার কেউ আসেন কেবল কিছুটা শান্ত নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য। এ জায়গাকে অনেকেই চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ বলে থাকেন। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়, এটি শুধু একটি পার্ক নয়, বরং শহরের ভেতরে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত আশ্রয়।

রাত ১১টার পর সিআরবির ভেতর নেমে আসে গভীর নীরবতা। টাইগার পাস হয়ে প্রবেশ করতেই শহরের কোলাহল যেন পেছনে পড়ে যায়। দূরে ট্রেনের শব্দ, মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক আর তার মাঝখানে এক ধরনের স্থিরতা। একটি বেঞ্চে বসে থাকা দুই তরুণ সাকিব ও হামিদুল ইসলাম জানান, দিনের কাজ শেষে এখানে এসে কিছু সময় কাটানোই তাদের স্বস্তি। কাছেই কয়েকজন রিকশাচালক শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। যাদের কাছে সিআরবি শুধু একটি পার্ক নয়, বরং একটি আশ্রয়স্থল।

রাত ২টার দিকে সিআরবির শিরীষতলা এলাকায় দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কয়েকজন শ্রমিক চাদর মুড়িয়ে ঘুমিয়ে আছেন, কেউ কেউ আগুন জ্বালিয়ে চা বানাচ্ছেন। আব্দুল করিম নামে এক শ্রমিক বলেন, এখানে বাতাস ভালো, তাই রাতে ঘুমানো যায়। শহরের অন্য জায়গায় দম বন্ধ লাগে। এ সময়টায় বোঝা যায়, সিআরবি শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, এটি শহরের প্রান্তিক মানুষের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ও।

ভোর ৫টার পর আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সিআরবির রূপ বদলে যায়। দৌড়, হাঁটা, সাইক্লিং এবং হালকা কথোপকথনে এলাকা আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রতিদিনের মতো দৌড়াতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী নুর হোসেন বলেন, ডাক্তার হাঁটতে বলেছিল। কিন্তু তিনি এখানে এসে বাঁচার অনুভূতি পান। তরুণ সাইক্লিস্টদের একজনের ভাষায়, চট্টগ্রামে এমন খোলা জায়গা খুব কম, যেখানে সকালে এসে মুক্তভাবে শ্বাস নেওয়া যায়।

সকাল ৮টার পর ধীরে ধীরে ভিড় বাড়ে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা এখানে সময় কাটান। চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে রেলওয়ের কর্মচারী আশফাক কবির বলেন, অফিসে যাওয়ার আগে এখানে কিছু সময় না কাটালে দিন শুরুই হয় না। চায়ের কাপে শুধু পানীয় নয়, সেখানে মিশে থাকে দৈনন্দিন জীবনের গল্প, আলোচনা ও স্বস্তির মুহূর্ত।

দুপুরে সিআরবি তুলনামূলকভাবে শান্ত হয়ে আসে। গাছের ছায়ায় বসে থাকা এক বৃদ্ধ জানান, তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এখানে আসেন। আগে পরিবেশ আরো শান্ত ছিল, তবে এখনো জায়গাটির প্রতি তার ভালো লাগা কমেনি। এ সময় সিআরবি যেন নিজের ভেতরে ডুবে থাকা এক নীরব, ধীরগতির জগৎ হয়ে ওঠে।

বিকালে আবার সিআরবি ভরে ওঠে মানুষের উপস্থিতিতে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, পরিবার এবং প্রেমিকযুগল এখানে ভিড় করেন। কেউ কবিতা পড়েন, কেউ আড্ডা দেন, আবার কেউ নীরবে সময় কাটান। প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের শিক্ষার্থী নয়ন কর। তিনি মাঝেমধ্যে এখানে লেখালেখি করেন। তিনি বলেন, এখানে বসে লেখা না হলে তার লেখা আসে না। একই সময়ে দেখা যায়, অনেক যুগল নীরবে বসে সময় কাটাচ্ছেন যেখানে শহরের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু ব্যক্তিগত মুহূর্তের জায়গা তৈরি হয়।

সন্ধ্যার পর সিআরবির পরিবেশ আরো আবেগঘন হয়ে ওঠে। গাছের ছায়া, হালকা আলো এবং দূরের ট্রেনের শব্দ মিলিয়ে এক ধরনের নীরব সৌন্দর্য তৈরি হয়। সাংস্কৃতিক কর্মীরা এখানে গান, কবিতা ও নানা আয়োজন করেন। তাদের ভাষায়, সিআরবি শুধু একটি স্থান নয়, এটি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ। রাত ৯টার পর আবার ধীরে ধীরে মানুষের ভিড় কমে আসে। দিনের কোলাহল শেষে সিআরবি ফিরে যায় তার স্বাভাবিক নিস্তব্ধতায়।

একজন পথচারী হেঁটে যেতে যেতে বলেন, এ জায়গাটি না থাকলে চট্টগ্রাম শহর অনেক বেশি কঠিন হয়ে যেত।

২৪ ঘণ্টার এ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সিআরবি শুধু একটি সবুজ এলাকা নয়; এটি শহরের ভেতরে তৈরি হওয়া এক ধরনের জীবন্ত আশ্রয়, যেখানে মানুষ শুধু সময় কাটায় না, বরং কিছুটা শ্বাসও খুঁজে পায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...