ফেনী নদীর তীরে সরকার কর্তৃক জব্দ করা বিপুল পরিমাণ বালুর স্তূপ থেকে সোয়া দুই লাখ ঘনফুটের বেশি বালু রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে গেছে। আদালতের নির্দেশে পুনঃপরিমাপে এ তথ্য উঠে এসেছে। লোপাট হওয়া বালুর আনুমানিক বাজারমূল্য ৬৭ লাখ ১৪ হাজার ৯০০ টাকা। অন্যদিকে সরকারিভাবে জব্দ করা বালুর নিয়ন্ত্রণ ও বিক্রির অর্থ ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরে বিএনপির কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। এর জের ধরে একাধিক দফায় সংঘর্ষ, হামলা, গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
সর্বশেষ গত ২৬ জুলাই মধ্যরাতে জব্দ করা বালু চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় ছাগলনাইয়া জিরো পয়েন্ট থেকে বালুভর্তি দুটি ট্রাক আটক ও দুই চালককে আটক করা হয়। এ ঘটনায় পৃথক মামলায় তিন ট্রাকচালককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
বালু চুরির ব্যাপারে এস আই পংকজ দাসের দায়ের করা মামলা সূত্রে জানা যায়, আদালতের নির্দেশে ফেনী নদীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের জয়পুর এলাকায় সরকারি জব্দকৃত বালুর সঠিক পরিমাণ নির্ধারণে উপজেলা প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা প্রকৌশলী তৌহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ১৭০টি বালুর স্তূপ পরিমাপ করে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে তিনি ৩৮ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯৭ ঘনফুট বালু পাওয়া গেছে মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
কিন্তু ওই প্রতিবেদনের পর আদালতের নির্দেশে পুনরায় সরেজমিনে পরিমাপ করা হলে আগের প্রতিবেদনের সঙ্গে বাস্তব অবস্থার বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়ে। পুনঃপরিমাপে দেখা যায়, ১৭০টি বালুর স্তূপ থেকে মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৩০ ঘনফুট বালু কম রয়েছে। প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ৩০ টাকা হিসেবে এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৭ লাখ ১৪ হাজার ৯০০ টাকা।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টা থেকে ২০ জুলাই বিকাল ৫টা ২০ মিনিটের মধ্যে কোনো এক সময় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা সরকারি জব্দ করা বালু চুরি করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৩৭৯/৩৪ ধারায় ছাগলনাইয়া থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি শুভপুর ঘাট এলাকা থেকে চুরি করা বালুবোঝাই তিনটি ট্রাক জব্দ করে ছাগলনাইয়া থানা পুলিশ।
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার হওয়া চালকরা বালুর প্রকৃত মালিক কে, কিংবা কোথায় বালু নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি।
সর্বশেষ ঘোপাল ইউনিয়ন বিএনপির নেতা আলমগীর সিদ্দিকী ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে উপজেলা বিএনপির নেতা রিয়াজ উদ্দিন মজুমদার (টিপু)-এর ওপর হামলার অভিযোগ উঠে।
আহত রিয়াজ উদ্দিন মজুমদার অভিযোগ করেন, বালুর ব্যবসা বাবদ আলমগীর সিদ্দিকীর কাছে তার ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। ওই টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। গত শুক্রবার রাত ১টার দিকে জয়নাল ও ইসমাইল নামে দুই ব্যক্তি সমঝোতার কথা বলে তাকে ছাগলনাইয়া আদালত মাঠে ডেকে নেন।
তার দাবি, সেখানে পৌঁছানোর পর আলমগীর সিদ্দিকী চার থেকে পাঁচটি গাড়িতে করে সহযোগীদের নিয়ে এসে অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু করেন। এতে গুলির স্প্লিন্টার তার পায়ে বিদ্ধ হয়। পরে শটগান দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
এ সময় তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে তার গাড়িচালক আদনান, হুমায়ুন, সোহেল ও ইমন আহত হন।
এ ঘটনায় রিয়াজ উদ্দিন মজুমদার ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরো ২০ থেকে ৩০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ছাগলনাইয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
চোরাই বালুসহ ট্রাক ধরা পড়ার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তানভীর মেহেদী বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে দুই লাখ ঘনফুটের বেশি বালু চুরির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত পরিমাণ এবং কারা জড়িত তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দিনে-রাতে বড় ট্রাক ও পিকাপ ভর্তি করে জব্দ করা বালু বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টদের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে ছাগলনাইয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর ফারুক বলেন, ‘সরকারি বালু চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে। বিষয়টি এখন পুলিশের তদন্তাধীন। তদন্ত চলমান থাকায় এ বিষয়ে এ মুহূর্তে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’
সরকারি জব্দ করা বিপুল পরিমাণ বালু কীভাবে দিনের পর দিন লোপাট হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত, কারা এ বালু বিক্রি করেছে এবং এর পেছনে কোনো প্রভাবশালী চক্র কাজ করেছে কি না—এসব প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। তাদের দাবি, শুধু ট্রাকচালকদের গ্রেপ্তার করলেই প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়বে না। পুরো ঘটনায় জড়িত মূল হোতা, অর্থের লেনদেন এবং সরকারি সম্পদ লোপাটের নেপথ্যের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনাগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
## আবু দারদা যোবায়ের
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

