পবিত্র ঈদুল আজহার লম্বা ছুটিতে আনন্দ উদযাপনে মুখর হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম নগরীর বিনোদন কেন্দ্রগুলো। ঈদের আমেজে পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দঘন সময় কাটাতে পার্ক, উদ্যান, চিড়িয়াখানা ও জাদুঘরসহ দর্শনীয় স্থানগুলোতে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। ঈদের দিন বিকাল থেকে গত রোববার পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে একই চিত্র দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই ঈদে নগরীর বেশিরভাগ পার্ক ও দর্শনীয় স্থানে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ছয়গুণ বেশি পর্যটক ভিড় করেছেন। কেবল ছুটির চার দিনে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় প্রায় ৩৬ হাজার দর্শনার্থী ঘুরতে আসেন। এতে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৫ লাখ টাকা আয় করেছে। বেসরকারি পার্কগুলোতেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দর্শনার্থী যান। এতে এসব বিনোদন কেন্দ্রে তিন থেকে চারগুণ বেশি আয় হয়েছে।
রোববার নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে ফয়’স লেক সি ওয়ার্ল্ড, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, পারকি সৈকত, কর্ণফুলী ব্রিজ, সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সি বিচ, চন্দ্রনাথ পাহাড়, মিরসরাইয়ের মহামায়া লেক, মুহুরী প্রজেক্ট ও ভাটিয়ারি সানসেট পয়েন্টের মতো জনপ্রিয় স্থানগুলো পর্যটকদের পদচারণে মুখর ছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোববার সকাল থেকে পতেঙ্গায় সাগরের ঢেউয়ের মায়ায় সৈকতে জড়ো হতে থাকেন দর্শনার্থীরা; যা বিকালে রূপ নেয় জনসমুদ্রে। কেউ মেতেছিলেন ঢেউয়ের মিতালিতে, কেউ ব্যস্ত ছিলেন ফ্রেমবন্দি হতে। স্পিডবোট ও ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ সৈকতের আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল।
পতেঙ্গার ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদুল আজহার দিন দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা আসতে থাকেন। এরপর শুক্র, শনি ও রোববারও দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। এতে সেখানে থাকা দেড় শতাধিক দোকানেও ভালো বিক্রি হয়েছে। বিশেষ করে কাঁকড়াসহ বিভিন্ন ধরনের সি ফুডে ভ্রমণপিপাসুদের আগ্রহ বেশি ছিল।
এদিকে নগরীর বাইরে উপশহর সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী ও আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকতেও দেখা গেছে ভ্রমণপিপাসুদের উপচেপড়া ভিড়। এছাড়া সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী সানসেট পয়েন্ট, ক্যাফে২৪ পার্কে দর্শনার্থীর ভিড় ছিল। দিনের শেষ প্রহরে মনোহর সূর্যাস্ত উপভোগ করতে এখানে জড়ো হন অনেকে ।
শুক্র ও শনিবার সবচেয়ে ভিড় লাগে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রোববার তার অর্ধেক হয়ে যায়। এছাড়া নগরের আগ্রাবাদ জাম্বুরী পার্ক, জুলাই স্মৃতি উদ্যান, কল্পলোক সৈকত, অনন্যা আবাসিক, বায়োজিদ লিংক রোড ও আউটার রিং রোডে শত শত পর্যটক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করেন।
প্রাণোচ্ছল চিড়িয়াখানা ও ফয়’স লেক
রোববার চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় ঢোকার মুখে দর্শনার্থীর দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। পরিবারসহ ঘুরতে আসা রমজান হোসেন বলেন, ঈদের পর সবাইকে নিয়ে এখানে এলাম। চিড়িয়াখানার পরিধি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ঘুরে বেশ ভালো লাগছে।
একই কথা বলেন রাহাতুল ইসলাম। তিনি বলেন, চিড়িয়াখানায় মাত্র ৭০ টাকায় ঘোরাঘুরি করা যায়। প্রতিবার মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানদের নিয়ে এখানে আসে। এখানের ব্যবস্থাপনা ভালো। পুরো চিড়িয়াখানাকে আগের চেয়ে অনেক সুন্দর করা হয়েছে।
পাশেই অবস্থিত ফয়’স লেকের কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, সি ওয়ার্ল্ড ও বেস ক্যাম্পেও দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভিড় ছিল রোববার। শুক্র ও শনিবার দুপুরেও পার্কটির সি ওয়ার্ল্ডের সুইমিংপুলে শত শত মানুষকে মেতে উঠতে দেখা গেছে জলকেলিতে। রোববারও এমন দৃশ্য দেখা যায়।
কনকর্ড এন্টারটেইনমেন্ট কোম্পানির বিপণন ব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, ঈদের দ্বিতীয় দিনে প্রায় তিন হাজার দর্শনার্থী এসেছেন। রোববার পর্যন্ত চার দিনে প্রায় ১৩ হাজার দর্শনার্থী আমাদের তিনটি পার্ক ভ্রমণ করেছেন। অনেকে কদিনের জন্য বেস ক্যাম্প ও রিসোর্টে রুম বুকিং নিয়েছেন।
তিনি বলেন, আগামীকাল ছুটির শেষ দিনেও দর্শনার্থী বাড়বে। আমরা প্রায় ৪০০ জনশক্তি দিয়ে পর্যটকদের সেবায় কাজ করছি। ঈদ উপলক্ষে জনবলও বাড়াতে হয়েছে আমাদের।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর শাহাদাত হোসেন শুভ বলেন, এবার ঈদুল আজহায় আগের চেয়ে পাঁচগুণ দর্শনার্থী হয়েছেন। তবে ঈদুল ফিতরের চেয়ে কিছুটা কম। আমাদের চার দিনে আয় হয়েছে ২৫ লাখ টাকার মতো। বর্তমানে ৬৮ প্রজাতির ৫২০টি প্রাণী রয়েছে চিড়িয়াখানায়।
ঈদুল আজহার ছুটিতে বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের বিপুল সমাগমে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে তৎপরতা দেখাচ্ছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। তারা সমুদ্রের গভীরে না যাওয়ার জন্য সৈকত এলাকায় সার্বক্ষণিক মাইকিং করছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম ট্যুরিস্ট পুলিশের সুপার উত্তম প্রসাদ পাঠক বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ঘোরাঘুরি নিশ্চিতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ছুটির শেষ দিন পর্যন্ত পুলিশ এই বিশেষ সতর্কাবস্থানে থাকবে বলে জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

