মুহুরী নদীর পানি বাড়তে থাকায় নোয়াখালীতে বন্যার আশঙ্কা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ

মুহুরী নদীর পানি বাড়তে থাকায় নোয়াখালীতে বন্যার আশঙ্কা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ

নোয়াখালীতে তিনদিনের বিরতিহীন প্রবল বৃষ্টিতে জেলার অধিকাংশ সড়ক ও অলিগলির রাস্তাঘাট ডুবে গেছে এবং বাসা বাড়িতে ঢুকে গেছে পানি। একদিকে ভারী বর্ষণ, অন্যদিকে খাল বিল জলাশয়ে পানি আটকে থেকে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এর মধ্যে ফেনীর মুহুরী নদীর পানি ব্যাপকহারে বাড়ায় এ পানি গত বছরের ন্যায় নোয়াখালীর দিকে প্রবাহিত হলে এ জেলায় ফের বন্যার আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

বুধবার ও বৃহস্পতিবারের পরীক্ষাগুলো স্থগিত থাকবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীর চারটি উপজেলার মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুর উদ্দিন জাহাঙ্গীর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুর উদ্দিন জাহাঙ্গীর জানান, দু’দিন ধরে নোয়াখালীতে টানা বৃষ্টির ফলে সদর, সুবর্ণচর, কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। এ পরিস্থিতিতে ওই সব উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা তার কাছে বুধ ও বৃহস্পতিবার মাধ্যমিক পর্যায়ের সব স্কুল ও মাদরাসার চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত রাখার নির্দেশনা চেয়েছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আগামী দুই দিনের পরীক্ষা স্থগিত রাখতে বলেছেন সংশ্লিষ্টদের।

বুধবার (৯ জুলাই) জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো.রফিকুল ইসলাম বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় নোয়াখালীতে ২১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে আরও ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এই অবস্থায় নদীবন্দরে ১ নম্বর ও সমুদ্র বন্দরে ৩নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদফতর।

অপরদিকে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে জেলার অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এরই মধ্যে অনেকটা বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের বসতঘরে পনি ঢুকেছে। বেশি জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে জেলা শহর মাইজদীতে। এখানে বিভিন্ন সড়ক ও পাড়া-মহল্লা পানিবন্ধী হয়ে পড়েছে। নোয়াখালী পৌর শহরের স্টেডিয়াম পাড়া, জেলখানা সড়ক এলাকা, মাইজদী স্টেশন রোড (আনসার ক্যাম্প সড়ক), ফকিরপুর, হরিনারায়ণপুর, লক্ষ্মীনারায়ণপুর, হাউজিংসহ বেশিরভাগ এলাকার সড়কগুলোতে হাটুর কাছাকাছি পানি ওঠে গেছে। এছাড়া অধিকাংশ এলাকায় নিচতলা ও কাচা ঘরগুলোতে পানি ডুকে গেছে। ফলে পানিবন্ধী হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে বাসিন্দারা। শহরের বেশিরভাগ সড়কে খানাখন্দ থাকায় সড়কগুলো মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব এবং পানি নিষ্কাশনের নালা ও জলাশয় গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় শহরবাসীর এ দুর্ভোগ। বিগত সময়ে নোয়াখালী পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ খান সোহেল ও পৌর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন অনেকে। অভিযোগ রয়েছে সোহেল মেয়র থাকাকালীন সময়ে পৌরসভার সকল ঠিকাদারী কাজ বিভিন্ন লাইসেন্স এ তিনি নিজেই করতেন ও তার লোকজন করতো। এখানে অধিকাংশ প্রজেক্ট নামমাত্র কাজ করে লুটপাট করে খেয়ে ফেলেছে মেয়র ও তার লোকজন। হালকা বৃষ্টিতেই নোয়াখালী পৌরসভা এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এদিকে টানা বৃষ্টিতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভা এলাকার করালিয়া,মওদুদ স্কুল,কলেজ গেইট, হাসপাতাল গেইটসহ অনেক এলাকার রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে গেছে। অপরদিকে, বেগমগঞ্জের একলাশপুর শরীফপুর জিরতলী ও বেগমগঞ্জ ইউনিয়, কবিরহাট ও সুবর্ণচর, সেনবাগ উপজেলায় মুষলধারে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় এলাকাবাসীদের জলাবদ্ধতা দূর করতে সচেতন হওয়া জরুরি বলে মনে করেন সচেতন মহল।

এদিকে ২০২৪ সালের প্রথমদিকে নোয়াখালী পৌরসভার মাইজদী স্টেশন সড়কটি (আনসার ক্যাম্প সড়ক) পৌরসভা পানির লাইন মেরামতের জন্য সড়কের মাঝখানে খোঁড়াখুড়ি করে, পুরো সড়ক তছনছ করে দেয়। এর কিছুদিনের মধ্যে সড়কের পাশে প্রায় দু’কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণের জন্য সড়কটি খুড়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রায় দেড় বছর শেষ হয়ে গেলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ড্রেনের কাজ এখনো শেষ করেনি। পানির লাইন মেরামতের জন্য কাঁটা ও ড্রেন নির্মাণের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি, দু'ধপা কাটাকাটির ফলে সড়কটি খানা খন্দমা গর্ত নালা নর্দমায় মরণফাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সড়কে যান চলাচল কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত এ সড়কে দুর্ঘটনার স্বীকার হচ্ছে স্কুল কলেজগামী শতশত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। এ সড়কে জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর, শিশু পরিবার, আনসার ভিডিপি ক্যাম্প, জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ পাঁচটি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই সিএনজি রিস্কা ও অটো রিস্কা এ সড়কে চলে না। যদিও চলে দ্বিগুণ তিনগুণ ভাড়া দিয়ে যেতে হয় মানুষকে। ফলে সাধারণ মানুষ একদিকে লোকসান গুনছেন অপরদিকে চরম বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াখালী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী বেলাল আহমদ খান জানান, সড়কটি বিগত তিন মাস পূর্বে টেন্ডার হয়েছে। মেসার্স সারোয়ার এন্টারপ্রাইজ কাজটি পায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়িমসি করে সড়কের কাজ করেননি। আমরা তাকে একাধিকবার নোটিশ করেছি। নিয়ম অনুযায়ী কাজ না করলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। অতি দ্রুত এ সড়ক মেরামতের ব্যবস্থা করা হবে।

এছাড়া মাইজদী পৌর বাজার, মাইজদী বাজার, দত্তেরহাট, সোনাপুরসহ নোয়াখালীর পৌরসভার বিভিন্ন বাজারে জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন আগত ক্রেতা-বিক্রেতারা।

এদিকে রেললাইন অনেক উঁচু হওয়ার পরেও ঢাকা সোনাপুর রেললাইনের চৌমুহনী থেকে সোনাপুর পর্যন্ত রেল লাইনের উপরে বিভিন্ন স্থানে পানি উঠে গেছে। রেললাইনের স্লিপার অনেকটা ডুবোডুবু অবস্থায় আছে।

নোয়াখালী স্টেশন মাস্টার মীর আসাদুজ্জামান জানান, গত তিন দিনের বিরতিহীন বৃষ্টির জলাবদ্ধতায় চৌমুহনী থেকে সোনাপুর পর্যন্ত রেল লাইনের স্লিপার অধিকাংশ জায়গায় ডুবোডুবু অবস্থায় রয়েছে। আজ লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপকূল ট্রেন আসবে, তবে গতিবেগ থাকবে ২০ কিলোমিটার।

পানি উন্নয়ন বোর্ড এর নির্বাহী প্রকৌশলী হালিম সালেহী জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে জেলায় ২ দিনে পানি বেড়েছে ২৭ সেন্টিমিটার। নোয়াখালী সদরে পানি বিপদ সিমার ৪ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। টানা বৃষ্টিতে নোয়াখালীর সদর, কো্ম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সুবর্ণচরে বেশি জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। মানুষ সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে বর্তমান এ দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। তবে আগামীকাল নাগাদ বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি বন্ধ হলে আটকা পানিগুলো নেমে যাবে।

এ নিয়ে নোয়াখালী জেলা প্রশাসক খন্দকার ইসতিয়াক আহমেদ বিকেল পাঁচটার সময় আমার দেশকে বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে যারা দুর্যোগ কবলিত তাদেরকে ত্রাণ দেয়া হবে, অথবা দুর্যোগকবলিত মানুষ যোগাযোগ করলে তাদেরকে ত্রানের ব্যবস্থা করা হবে। এ পর্যন্ত কোন কোন এলাকা অথবা কত মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন এমন প্রশ্নের বিষয়ে তিনি জানাতে পারেননি। বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাগণ ভিজিট করে জেলা প্রশাসককে জানাবেন, তবে এখনো জানাননি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন