বিচিত্র পেশা

কুঁচিয়া ধরেই চলে তাদের জীবনের চাকা

কুঁচিয়া ধরেই চলে তাদের জীবনের চাকা

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। আকাশজুড়ে মেঘ, টিপটিপ বৃষ্টি। হাঁটুসমান পানিতে নেমে কাঁধে বাঁশের তৈরি বিশেষ ‘চাঁই’ আর হাতে এক মুঠো কেঁচো নিয়ে জলাভূমির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন নিতাই চন্দ্র সরকার। কেঁচোই তার সারাদিনের মূলধন। এই কেঁচোর টোপে ধরা পড়ে কুঁচিয়া, যা বিক্রির আয়েই চলে আট সদস্যের সংসার।

বাংলাদেশে জীবিকার নানা বিচিত্র পেশার মধ্যে কুঁচিয়া শিকার একটি ব্যতিক্রমী পেশা। জীবিকার তাগিদে সিলেটের হবিগঞ্জ থেকে বহু দূরের উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে ছুটে এসেছেন একদল মানুষ। খাল-বিল, ডোবা ও জলাভূমিতে কুঁচিয়া সংগ্রহ করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ হয়।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় ভাষায় কেঁচোকে বলা হয় ‘মেটোসাপ’। এই কেঁচো বাঁশের তৈরি বিশেষ ফাঁদে গেঁথে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। পরদিন ভোরে ফাঁদ তুলে কুঁচিয়া সংগ্রহ করা হয়। সব ফাঁদে অবশ্য কুঁচিয়া মেলে না। অনেক সময় শিং, কৈ, কিংবা টাকি মাছও ধরা পড়ে।

সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা নিতাই চন্দ্র সরকার প্রায় ৯-১০ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার বালুয়া চৌমুহনী এলাকায় আসেন। নিজ এলাকায় একই পেশায় যুক্ত থাকলেও সেখানে আয় ছিল খুবই কম। বর্তমানে বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি।

নিতাই একা নন। তার মতো সিলেট অঞ্চলের আরো ২০ থেকে ২৫ জন রামগঞ্জ উপজেলার ভোলাকোট, ভাটরা, ভাদুর, লামচর, দরবেশপুর ও চণ্ডীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার খাল-বিল আর জলাভূমিতে কুঁচিয়া সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কৃষিকাজে লোকসান, কাজের সংকট এবং দারিদ্র্যতাই তাদের এই পেশায় নিয়ে এসেছে।

কুঁচিয়া ধরা অত্যন্ত ধৈর্যের কাজ। দিনের বড় একটি সময় ব্যয় হয় কেঁচো সংগ্রহে। এরপর কেঁচো ফাঁদে গেঁথে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। সংগ্রহ করা কুঁচিয়া জীবিত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ হলে ঢাকায় পাঠানো হয়। প্রতি কেজি কুঁচিয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও এর উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে।

বর্ষাকালই কুঁচিয়া শিকারিদের সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম। এ সময় মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হয়। তবে বছরের বাকি সময় কুঁচিয়া কমে যাওয়ায় আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের।

নিতাই চন্দ্র সরকার বলেন, বর্ষাকালে কিছুটা ভালো আয় হয়। কিন্তু অন্য সময় খুব কষ্টে চলতে হয়। আগের মতো এখন আর কুঁচিয়া পাওয়া যায় না।

আরেক কুঁচিয়া শিকারি স্বপন চন্দ্র বলেন, জীবিকার তাগিদে আমরা সুদূর সিলেট থেকে এখানে এসেছি। বর্ষাকালে মোটামুটি ভালো আয় হয়। কিন্তু শীতকালে কুঁচিয়া প্রায় পাওয়াই যায় না। তখন বাধ্য হয়ে অন্য কাজ খুঁজতে হয়।

রামগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ সিফাত বলেন, কুঁচিয়া পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী প্রাণী। এটি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এর প্রাকৃতিক আবাস সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কুঁচিয়া আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, কুঁচিয়া একটি মূল্যবান প্রাণিজ সম্পদ। এতে প্রচুর আমিষ ও ভিটামিন রয়েছে। রামগঞ্জে কুঁচিয়ার স্থানীয় বাজার না থাকলেও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিদেশের বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কেউ কুঁচিয়া চাষে আগ্রহী হলে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হবে।

জীবিকার প্রয়োজনে ভিটেমাটি ছেড়ে দূর জেলায় এসে কুঁচিয়া শিকারকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া এসব মানুষের জীবনসংগ্রাম নীরব হলেও অনন্য। বর্ষায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও বছরের অধিকাংশ সময় অনিশ্চয়তা আর সীমিত আয়ের মধ্যেই কাটে তাদের দিন। তবুও খাল-বিল আর জলাভূমিকে সঙ্গী করেই তারা টিকিয়ে রেখেছেন জীবনের চাকা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন