দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান যোগাযোগপথ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশে চার লেন উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে দেখা দিয়েছে অব্যবস্থাপনা, নকশাগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা সংকটের এক উদ্বেগজনক চিত্র। নির্মাণের প্রায় ১৬ বছর পরও নামার বাজার আন্ডারপাসে কাটেনি জনদুর্ভোগ। নকশাগত সীমাবদ্ধতা, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, জরুরি সেবার যান চলাচলে বাধা এবং দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতির সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি খুঁজে না পাওয়ার তথ্য। একই সঙ্গে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সরকারি ডিভাইডার কেটে তৈরি করা হয়েছে শতাধিক অবৈধ ইউ-টার্ন। ফলে দেশের ব্যস্ততম এই মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশ এখন পরিণত হয়েছে দুর্ঘটনার উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো কর্পোরেশনের ৯ নম্বর প্যাকেজে সীতাকুণ্ড বাইপাস সড়ক ও নামার বাজার আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘ সময় পরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রকল্পের মূল নকশা, কারিগরি বিবরণী এবং ব্যয়সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রকৌশল সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের নির্মাণসংক্রান্ত নথি সংরক্ষিত থাকা ভবিষ্যৎ সংস্কার, সম্প্রসারণ, কাঠামোগত মূল্যায়ন এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনার জন্য অপরিহার্য। এসব নথি না থাকলে প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। জাতীয় মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
চার লেন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত নামার বাজার আন্ডারপাস বর্তমানে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণের সময় সীতাকুণ্ডের দ্রুত শিল্পায়ন, বাড়তে থাকা জনসংখ্যা, ভারী যানবাহনের চাপ এবং ভবিষ্যৎ জরুরি সেবার প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
আন্ডারপাসটির উচ্চতা ও নকশাগত সীমাবদ্ধতার কারণে ফায়ার সার্ভিসের বিশেষায়িত ভারী উদ্ধারযান চলাচল করতে পারে না। সীতাকুণ্ডের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগ ঘটলে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন আমার দেশকে বলেন, নামার বাজার এলাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে নিচু আন্ডারপাসের কারণে ফায়ার সার্ভিসের বিশেষায়িত ভারী উদ্ধারযান চলাচল করতে পারবে না। এতে উদ্ধারকাজে বিলম্ব হবে এবং জীবন ও সম্পদের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়বে।
এদিকে বর্ষা মৌসুমে নামার বাজার আন্ডারপাস পরিণত হয় জলাবদ্ধতার কেন্দ্রে। সামান্য বৃষ্টিতেই আন্ডারপাস ও সংযোগ সড়কে পানি জমে যায়। কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে সীতাকুণ্ড মহাসড়কের নিরাপত্তায় বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ ইউ-টার্ন। সীতাকুণ্ড পৌর সদর, বাড়বকুণ্ড, জোড়ামতল, কুমিরা, মাদামবিবিরহাট ও ভাটিয়ারীসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সরকারি কংক্রিট ডিভাইডার কেটে তৈরি করা হয়েছে শতাধিক পারাপারের পথ।
সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও ডিভাইডার ভেঙে, কোথাও কংক্রিট ব্লক সরিয়ে অবৈধ ইউ-টার্ন তৈরি করা হয়েছে। এসব পথ দিয়ে প্রতিদিন ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন দ্রুতগতির মহাসড়কে হঠাৎ এক লেন থেকে অন্য লেনে প্রবেশ করছে। এতে দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের আকস্মিকভাবে গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সড়ক নিরাপদ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, যেভাবে মহাসড়কের ডিভাইডার কাটা হচ্ছে, তাতে সড়কটি ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। প্রতিটি অবৈধ ইউ-টার্ন একটি সম্ভাব্য দুর্ঘটনাস্থল।
তিনি আরও বলেন, সীতাকুণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানকার যানবাহনের চাপ বিবেচনায় পরিকল্পিত ইউ-টার্ন, সার্ভিস রোড এবং নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে ডিভাইডার ক্ষতিগ্রস্তকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
প্রকল্পের নথি না পাওয়ার বিষয়ে সীতাকুণ্ড পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেন, এই সমস্যা পৌরসভার কারণে সৃষ্টি হয়নি। মূল বাইপাস সড়কের নকশাগত ত্রুটির কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, প্রকল্পটি সিনোহাইড্রো কর্পোরেশনের ৯ নম্বর প্যাকেজের আওতায় বাস্তবায়িত হয়েছিল। বর্তমানে কার্যালয়ে নকশা ও ব্যয়সংক্রান্ত নথিপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জনদুর্ভোগ কমাতে সম্ভাব্য কারিগরি সমাধানের বিষয়েও কাজ চলছে।
চট্টগ্রাম সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হালিম আমার দেশকে বলেন, মহাসড়কের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়া হবে এবং জরুরি সেবার যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশ শুধু একটি আঞ্চলিক সড়ক নয়; এটি দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ। তাই বড় কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটার আগেই প্রকল্পের হারিয়ে যাওয়া নথি অনুসন্ধান, আন্ডারপাসের নকশাগত সমস্যা সমাধান, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু এবং অবৈধ ইউ-টার্ন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

