চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় একের পর এক প্রাণনাশের হুমকি পান সাবেক স্থানীয় এক বিএনপি নেতা। ‘কীরে…, শোন, তুই বাঁচতে চাইলে চট্টগ্রাম নয়, দেশ ছেড়ে যাগোই।’ এমন অন্তত ১৫টি হুমকির ভয়েস মেসেজ পেয়েছেন তিনি।
প্রাণনাশের হুমকি পাওয়া আজিজ উদ্দিন বায়েজিদ বোস্তামী থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তার অভিযোগ, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ আলী খানের সহযোগী ডেভিড ইমন ওরফে মোবারক হোসেন ইমন তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করতেই ধারাবাহিকভাবে এসব হুমকি দেন। শুধু হুমকিতেই থেমে থাকেনি বিষয়টি; তার ভাইয়ের দোকানেও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রাণনাশের আশঙ্কা চরমে পৌঁছালে শেষ পর্যন্ত প্রায় তিন মাস আগে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন আজিজ উদ্দিন। বর্তমানে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে অবস্থান করছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি দেশটির নাম প্রকাশ করতে চাননি।
আজিজ উদ্দিনের দাবি, ২০২৫ সালের নভেম্বরে তার বড় ভাই সরওয়ার বাবলা গুলিতে নিহত হওয়ার পর থেকেই তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ভয়ভীতি, হুমকি এবং নানা ধরনের চাপের মুখে থাকতে হয়েছে তাকে। প্রায় পাঁচ মাস পুলিশি নিরাপত্তায় থাকার পরও নিজের জীবন নিরাপদ মনে না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ বলেন, চট্টগ্রামে তার কোনো বাহিনী নেই। তার নামে যারা চাঁদাবাজি ও খুনোখুনি করছে, প্রশাসন তাদের গ্রেপ্তার করুক। ‘এআই’ দিয়ে তার ভয়েস বানিয়ে চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আজিজের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের উপজেলায় সন্ত্রাসীদের হুমকি, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার কারণে ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ এলাকা, এমনকি দেশও ছেড়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি চাঁদাবাজি, গুলিবর্ষণ ও খুনের এসব অভিযোগের কেন্দ্রে বারবার এসেছে বড় সাজ্জাদের নাম। তবে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় আজিজ এবং ডাকাত বাহিনীর নামও এসেছে চাঁদাবাজির তালিকায়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নগরের পাশাপাশি হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায়ও সাজ্জাদ অনুসারীদের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
বায়েজিদ এলাকার এক ব্যবসায়ী প্রায় এক দশক আগে দেশ ছাড়ার কথা জানিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলেই বড় সাজ্জাদের লোকজনের চাঁদাবাজি ও হুমকির মুখে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার দাবি, সে সময় বায়েজিদ থানার ওসি বিষয়টি জানতেন।
তিনি বলেন, প্রথমে চাঁদার জন্য চাপ দেওয়া হয়, পরে নানাভাবে ভয় দেখানো শুরু হয়। এক পর্যায়ে বুঝতে পারেন দেশে থেকে ব্যবসা চালানো তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তখন পরিবার নিয়ে বিদেশে চলে যান তিনি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বিদেশে থেকেই ফোনে চাঁদা দাবি এবং দেশে থাকা সহযোগীদের দিয়ে হামলা-অস্ত্রবাজি চালানোর কারণেই তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে গত দুবছরে আরো কয়েকজন ব্যবসায়ীর দেশ ছাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের প্রত্যেকের বক্তব্যে একই ধরনের আশঙ্কা—চাঁদা না দিলে হামলা, গুলি কিংবা পরিবারের সদস্যদের ওপর আক্রমণের ভয় রয়েছে।
নিরাপত্তা শঙ্কায় দেশত্যাগ
রাঙ্গুনিয়া পরিস্থিতির আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় স্থানীয় সাংবাদিক ও বাসিন্দাদের বক্তব্যে। দৈনিক আজাদীর রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি জগলুল হুদার দাবি, উপজেলায় শতাধিক পরিবার সন্ত্রাসীদের ভয়ে দেশ ছেড়েছে। নিরাপত্তার কারণে এসব পরিবারের অধিকাংশ সদস্য প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
সম্প্রতি সরফভাটার ৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবু বক্কর বাদশা ফেসবুক লাইভে এসে নিজের পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ করেন। তিনি জানান, সন্ত্রাসীরা তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে স্ত্রী, মা ও বোনদের ওপর আক্রমণ করেছে। এর আগে তার বাবা সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল মালেককে হত্যা করা হয়। সে সময় তাকে মামলা না করার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। পরে নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি বিদেশে চলে যান।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন বাহারের ভাষ্য, উপজেলার সরফভাটার পশ্চিমাংশ, মীরেরখীল ও পাহাড়ঘেঁষা কয়েকটি গ্রামের বহু মানুষ সন্ত্রাসীদের ভয়ে এলাকা ছেড়েছে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা শহরে বা বিদেশে চলে গেছেন। যারা যেতে পারেননি, তাদের অনেকে চাঁদা বা মাসোহারা দিয়ে এলাকায় টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
রাঙ্গুনিয়া আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী অবশ্য এসব পরিস্থিতির জন্য বালু ব্যবসাকে দায়ী করছেন। তিনি বলেন, আমি এলাকায় বালু ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছি। আশপাশের এলাকা থেকে লোকজন এসে রাঙ্গুনিয়ায় হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তার মতে, নদী ও পাহাড়ঘেঁষা দুর্গম এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সুযোগ থাকলে সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারেরও সুযোগ তৈরি হয়।
এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পৃথক একটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানান হুম্মাম কাদের। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তারা অনুমোদনও দিয়েছেন। আশা করি এটি চালু হলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম অনেকটা বন্ধ হয়ে যাবে।
তবে পুলিশের ভাষ্যে রাউজান-রাঙ্গুনিয়ার বালুমহালকেন্দ্রিক সংঘাতে শুধু বড় সাজ্জাদ নয়, আজিজ ও ডাকাত আলম বাহিনীর নামও উঠে এসেছে।
নিরাপত্তাহীনতা
৫ আগস্টের পর রাউজানে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এপ্রিল পর্যন্ত গত ২১ মাসে সেখানে ২২-২৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, নিহতদের প্রত্যেকেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে গুলি ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ধরন স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
এপ্রিলের শেষদিকে রাউজানে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই যুবদলকর্মী নিহত হন। গত জুনে গুলিতে নিহত হন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ চৌধুরী। তার বালুমহাল ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার কথা উল্লেখ করে স্থানীয় বিরোধের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে।
দেশ থেকে বিদেশে চলে যাওয়ার ঘটনার পাশাপাশি বিদেশ থেকে দেশে ফিরে সহিংসতার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৮ এপ্রিল রাঙ্গুনিয়ার প্রবাসী আলমগীর হোসেনের লাশ বাড়ির বাইরে পাওয়া যায়। চান্দগাঁওয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর নিহত হন প্রবাসী মো. আকিব।
চট্টগ্রামের অপরাধজগতে বড় সাজ্জাদ আলী খানের নাম বহু বছর ধরেই আলোচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কাছে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, খুন, অস্ত্রবাজি ও অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করা এই সন্ত্রাসী সেখান থেকেই চট্টগ্রামে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগও এসেছে তার নামে।
জানুয়ারিতে চাঁদার ফোনে সাড়া না দেওয়ায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি করার অভিযোগে উঠে আসে বড় সাজ্জাদের নাম। পুলিশ তখন দাবি করেছিল, বিদেশে অবস্থান করেও তিনি চট্টগ্রামের অপরাধচক্রের ওপর প্রভাব রাখছেন। মে মাসে চান্দগাঁও থেকে অস্ত্রসহ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তাদের বড় সাজ্জাদের সহযোগী বলে দাবি করে।
ব্যবসায়ী মুজিবুরের বাড়িতে গুলি ও রাজু হত্যার ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথাও জানায় পুলিশ। জুনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ ও অস্ত্রবাজির অভিযোগে ফের উঠে আসে বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম।
অভিযোগ যেসব এলাকায়
স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের বক্তব্যে চট্টগ্রামের কয়েকটি এলাকার নাম বারবার উঠে এসেছে। নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, বাকলিয়া ও চান্দগাঁওয়ের পাশাপাশি জেলার হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি ও হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাঙ্গুনিয়ায় বিশেষভাবে সরফভাটার পশ্চিমাংশ, মীরেরখীল এবং পাহাড়ঘেঁষা কয়েকটি গ্রাম নিয়ে অভিযোগ বেশি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর নজরদারি ও দ্রুত অভিযান পরিচালনা কঠিন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। ফটিকছড়ি ও রাউজানের পাহাড়ি এলাকাগুলোতেও সন্ত্রাসীদের আত্মগোপনের অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান শওকত আলী বলেন, নগর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঠেকাতে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অপরাধের অভিযোগ বেশি, সেসব এলাকায় টহল, চেকপোস্ট ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, সাধারণ মানুষ যাতে ভয়ভীতি ছাড়াই থানায় অভিযোগ করতে পারেন, সে জন্য পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজি, হুমকি কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক পুলিশকে অবহিত করার আহ্বান জানান তিনি।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নিচ্ছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। হাটহাজারীর এক চিকিৎসক চাঁদা দাবির অভিযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করেছি।
পুলিশ সুপার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলার প্রতিটি থানায় টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোথাও কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান কঠোর। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, হত্যাকাণ্ড কিংবা সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



