পদ্মা কেড়ে নিয়েছে ভিটে

দারিদ্র্য কেড়ে নিতে পারেনি জিপিএ-৫ পাওয়া আমেনার স্বপ্ন

দারিদ্র্য কেড়ে নিতে পারেনি জিপিএ-৫ পাওয়া আমেনার স্বপ্ন
মা-বাবার সঙ্গে আমেনা। ছবি: আমার দেশ

প্রমত্তা পদ্মার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়েছে পরিবার। অন্যের জমিতে খাজনা দিয়ে টিনের ঘরে বসবাস। সংসারে নিত্যদিনের অভাব-অনটন। তার ওপর মা কিডনি রোগে আক্রান্ত। ফলে রান্নাবান্নাসহ ঘরের নানা কাজ সামলাতে হয়েছে তাকেই।

এত প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেনি পড়াশোনা। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান আমেনা। তার স্বপ্ন—ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সেবা করা।

বিজ্ঞাপন

গত সোমবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আমেনার সাফল্যে আনন্দিত পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসী। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নদীভাঙন, দারিদ্র্য, অসুস্থ মা এবং নানা পারিবারিক সংকটের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প।

বৃহস্পতিবার সকালে শিবচর উপজেলার মাদবরের চর ইউনিয়নের চরকান্দি গ্রামে আমেনাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টিতে কাদাময় ও পিচ্ছিল উঠান পেরিয়ে টিনের ঘরের সামনে মায়ের কাজে সহযোগিতা করছে আমেনা। মাত্র একটি কক্ষের ঘরে গাদাগাদি করে রাখা আসবাবপত্রের ফাঁকে রয়েছে তার ছোট্ট পড়ার টেবিল। সংসারের কাজের পাশাপাশি এই টেবিলেই বসে পড়াশোনা করে সে।

আমেনার পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১২ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে তাদের বসতভিটা ও সহায়-সম্বল হারিয়ে যায়। তাদের মূল বাড়ি ছিল শিবচরের চরজানাজাত ইউনিয়নের পূর্ব খাস বন্দরখোলা এলাকায়। নদীভাঙনের পর পরিবারটি মাদবরের চর ইউনিয়নের চরকান্দি গ্রামে এসে অন্যের জমিতে খাজনা দিয়ে বসতি গড়ে। এ পর্যন্ত অন্তত দুইবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে পরিবারটি।

আমেনার বাবা হাবিবুর রহমান ওরফে ইলিয়াস কৃষক। অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়েই স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে সংসার চালান তিনি। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করাও ছিল কঠিন।

অন্যদিকে আমেনার মা জরিনা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না তিনি। ফলে রান্নাবান্নাসহ ঘরের নানা কাজ আমেনাকেই করতে হয়। সংসারের কাজ শেষ করে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেত সে। অভাবের কারণে প্রাইভেট পড়ার সুযোগও তেমন পায়নি।

আমেনার মা জরিনা খাতুন বলেন, আমরা নদীভাঙা মানুষ। কৃষিকাজ করে সংসার চলে। সংসারে সব সময় অভাব-অনটন লেগেই থাকে। আমি কিডনি রোগে আক্রান্ত। দুই ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে টানাটানির সংসার। তবে আমেনার পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহ। নিজের ইচ্ছায় বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়েছে। ঠিকমতো প্রাইভেটও পড়াতে পারিনি। আমার মেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পড়তে চায়। কতটুকু পারব জানি না।

তবে পারিবারিক সংকট আমেনার স্বপ্নকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। নবম শ্রেণিতে তার রোল ছিল ১২। দশম শ্রেণিতে ওঠার পর ফল কিছুটা খারাপ হওয়ায় রোল হয়ে যায় ১৮। সেই ফলাফলই যেন তাকে আরও জেদি করে তোলে।

আমেনা বলেন, দশম শ্রেণিতে ওঠার পর আমার রেজাল্ট খারাপ হয়। রোল ১৮ হয়ে যায়। রেজাল্ট নিয়ে বাড়ি আসার পর আব্বা খুব মন খারাপ করেছিলেন। আব্বার মলিন মুখ দেখে আমার খুব কষ্ট হয়। তখন আমার মধ্যে জেদ তৈরি হয় আমাকে ভালো করতেই হবে। এরপর আমি আরও চেষ্টা করতে থাকি।

তিনি বলেন, আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা অনেক। চাইলেই বাবার পক্ষে আমার সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। মা অসুস্থ। ঘরের রান্নাবান্না করেও আমাকে স্কুলে যেতে হয়েছে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমার স্কুলের স্যাররাও আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন, বিশেষ করে গণিতের পবিত্র স্যার।

এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি জানিয়ে আমেনা বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমি অনেক খুশি। ফলাফল নিয়ে অনেক টেনশনে ছিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল পেয়েছি। আমার এ পর্যন্ত আসার পথটা সহজ ছিল না। বাবা-মা ও শিক্ষকদের সহযোগিতা পেয়েছি। এখন ভালো কলেজে পড়তে চাই। আমার স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।

আমেনার বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, মেয়ে ভালো রেজাল্ট করেছে, আমরা খুবই আনন্দিত। অনেক কষ্টের মধ্যে তাকে পড়াশোনা করিয়েছি। আমি কৃষিকাজ করে সংসার চালাই। আমার সাধ্য অনুযায়ী মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। সবাই আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন।

প্রতিবেশী মো. ফারুক বলেন, আমেনার পরিবার পদ্মার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের জমিতে খাজনা দিয়ে বসবাস করছে। মেয়েটি খুব মেধাবী। কিন্তু ভালো কলেজে পড়ানোর মতো সামর্থ্য তার বাবার নেই। তারপরও পরিবার চেষ্টা করবে। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এ ধরনের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।

পাঁচ্চর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুল হক বলেন, আমেনা নিঃসন্দেহে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। পারিবারিক নানা প্রতিবন্ধকতা তার পড়ালেখায় বিভিন্ন সময়ে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সে থেমে থাকেনি। তার মা অসুস্থ থাকায় রান্নাবান্নাসহ ঘরের কাজও তাকে নিয়মিত করতে হয়েছে। এরপরও সে স্কুলে এসে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমেনার অদম্য চেষ্টার ফলেই সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। আর্থিক অনটন যেন তার উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য সমাজের বিত্তবানদের তার মতো মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। এ বছর আমাদের বিদ্যালয় থেকে ১১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের মধ্যে ইশরাত জাহান আমেনা অন্যতম অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী।

বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক পবিত্র চন্দ্র বল্লভ বলেন, ‘আমেনার অধ্যবসায় এবং শিক্ষকদের নির্দেশনা মেনে চলার মানসিকতা তাকে ভালো ফল করতে সহায়তা করেছে। তার আচার-ব্যবহারও ভালো ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিত।

ইংরেজি বিভাগের সহকারী শিক্ষক ইয়াসিন কাজী বলেন, আমেনা নিয়মিত ক্লাস করত এবং পাঠে মনোযোগী ছিল। বিদ্যালয়ের পড়াশোনার সঙ্গে নিজের পড়ার রুটিন সমন্বয় করে চলত এবং শিক্ষকদের গাইডলাইনকে গুরুত্ব দিত। তার মধ্যে ভালো কিছু করার প্রবল ইচ্ছা ছিল। ভবিষ্যতে সে আরও ভালো করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

পদ্মার ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে অন্যের জমিতে বসবাস করা এক পরিবারের সন্তান আমেনার জিপিএ-৫ এখন শুধু পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখার এক অনন্য উদাহরণ। তবে এসএসসির গণ্ডি পেরিয়ে এখন সামনে তার আরও কঠিন পথ—উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা এবং মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি।

অর্থের অভাবে যেন সেই পথ থেমে না যায়, সেটিই এখন আমেনা ও তার পরিবারের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।

অভাবকে পেছনে ফেলে জিপিএ-৫ অর্জন করা আমেনার চোখে এখন একটাই স্বপ্ন ভালোভাবে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হওয়া এবং একদিন অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সেই স্বপ্ন পূরণে তার প্রয়োজন শুধু সুযোগ ও সহযোগিতার হাত।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন