মানিকগঞ্জের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। ১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি এ অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জেলার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিদ্যালয়টি দীর্ঘ ১৪২ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার আলো বিলিয়ে চলেছে এবং প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই দেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে স্থাপিত এ বিদ্যালয় জেলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম বাতিঘর। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠাকালে ব্রিটেনের রাজসিংহাসনে রানি ভিক্টোরিয়া অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাই এ বিদ্যালয়কে স্থানীয় অনেকে ‘ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল’ নামেও অভিহিত করেন। আজও জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এটিকে ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল বলেই জানেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যারা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন, তারা হলেন ধানকোড়া, তেওতা, বালিয়াটি ও কাঞ্চনপুরের তৎকালীন জমিদাররা এবং ভাওয়ালের মহারাজা।
বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু রজনীকান্ত রায় (১৮৮৫-১৯১৫ পর্যন্ত)। এই পণ্ডিত ব্যক্তি তখন স্নাতক পাস ছিলেন। তার বাড়ি মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে। দীর্ঘ ৩০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি বিদ্যালয়টিকে সে সময় একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠে পরিণত করেন।
ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার প্রতিটি মহকুমায় মানসম্মত ও গৌরবোজ্জ্বল ফলাফলের অধিকারী একটি বালক উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ঐতিহ্য ও ফলাফলের বিচারে ১৯৬৮ সালে মানিকগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়।
প্রায় এক একর জায়গার ওপর নির্মিত বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করা হয়। প্রতিবছর এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে আসছে।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালে এ বিদ্যালয়টি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত ও পুরস্কৃত হয়। এখানে পাসের হার বরাবরই ৯৫ শতাংশের ওপরে থাকে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জন করে থাকে। এছাড়া জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় প্রতি বছর জেলার সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়ে থাকে এ প্রতিষ্ঠান থেকে।
প্রায় দেড় শতাব্দী পুরোনো এ বিদ্যালয়ের রয়েছে সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য। প্রখ্যাত লেখক ও নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী, দেশবরেণ্য কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও লেখক মোহাম্মদ কায়কোবাদ এবং বিএনপির সাবেক মহাসচিব মরহুম খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মতো ব্যক্তিরা এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক শিক্ষার্থীরা দেশের প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও শিল্প-বাণিজ্যসহ নানা পেশায় সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে অনেকে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃতও হয়েছেন। বর্তমানেও দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করে দেশের সেবা করে চলেছেন।
বিদ্যালয়টিতে ঘুরে দেখা যায়, সুপরিসর ক্যাম্পাস, বিশাল খেলার মাঠ, দুটি তিনতলা ও একটি দোতলা ভবনে আধুনিক শ্রেণিকক্ষে দুই শিফটে শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছেন। এছাড়া বিজ্ঞান শাখায় শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকবহির্ভূত জ্ঞানপিপাসা মেটানোর জন্য রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেবামূলক মনোভাব ও নেতৃত্ব বিকাশের লক্ষ্যে এ বিদ্যালয়ে রয়েছে চৌকস স্কাউট দল ও যুব রেড ক্রিসেন্ট।
পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমেও অংশ নিতে উৎসাহিত করা হয়। বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও স্কাউট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে মমতাজ বেগম দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রভাতি ও দিবা দুই শিফটে ১৭৪০ শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করা হয়। প্রভাতি শিফটে ২৪ এবং দিবা শিফটে ২৪ জন প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়াও বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির আটজন কর্মচারী রয়েছেন।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মমতাজ বেগম বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যপুস্তকনির্ভর নয়, বাস্তব জ্ঞান, নেতৃত্ব ও মূল্যবোধের দীক্ষা দিতে চেষ্টা করি। মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, এটি প্রগতিশীল সমাজ গঠনের কারখানাও।
মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেবল জেলার নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। শতবর্ষ পেরিয়ে ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরো অনেক প্রজন্মের আলোকিত মানুষ তৈরিতে কাজ করে যাবে—এ প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


