কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও জনবলসংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে ধুঁকছে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটি। ২০১৩ সালে হাসপাতালটি ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনবলের অভাবে হাওরবাসীর কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৫০ শয্যার জন্য অনুমোদিত চিকিৎসক পদের ৬৬ শতাংশই শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি জরুরি সেবাসংশ্লিষ্ট অন্যান্য পদের ৯১ শতাংশই খালি। অথচ দিন দিন হাসপাতালে ভর্তি ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সীমিত জনবল নিয়ে এই বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাওরাঞ্চলের ভৌগোলিক দুর্গমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং জরুরি রোগী পরিবহনের সংকট বিবেচনা করে হাওরের তিনটি উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ক্যাম্পাস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি মাতৃ ও শিশুসেবা সম্প্রসারণ, ভাসমান নৌ-হাসপাতাল ও ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ মো. মহিবুল্লাহ জানান, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের মধ্যেও হাসপাতালের অন্তর্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডের পাশাপাশি শিশু বিভাগে সেবা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে শিশু বিভাগও চালু করা হয়েছে।
হাসপাতালটিতে বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকের জন্য ৩৩টি পদ অনুমোদিত থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন, আর শূন্য রয়েছে ২২টি পদ। বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্টের ১১টি পদের একটিতেও কোনো চিকিৎসক নেই। এছাড়া মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন ও জরুরি বিভাগের চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে তীব্র সংকট রয়েছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে আটজন চিকিৎসক নিয়োগ পেলেও এর আগে ২০২৫-২৬ সালে অন্তর্বিভাগ, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে মাত্র দুজন চিকিৎসক দিয়ে সেবা চালাতে হয়েছে।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি জনবলেও রয়েছে বড় ঘাটতি। ৩০টি পদের বিপরীতে ২১ জন কর্মরত থাকলেও শূন্য রয়েছে ৯টি পদ। চারজন ধাত্রীর মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। অন্তর্বিভাগে সকাল, বিকেল ও রাত—প্রতিটি শিফটে ওয়ার্ডগুলোর জন্য নার্সদের দায়িত্ব বণ্টন করতে গিয়ে তাদের সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি ছয়জন পুরুষ নার্সকে ২৪ ঘণ্টাই জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
জরুরি সেবাসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ২২টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র দুজন, শূন্য রয়েছে ২০টি পদ। ইসিজি পরিচালনার জন্য কার্ডিওগ্রাফার, এক্স-রে টেকনিশিয়ান, অ্যাম্বুলেন্সচালক, জুনিয়র মেকানিক, আয়া, বাবুর্চি, মালি, ওয়ার্ডবয় ও ফার্মাসিস্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি রয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও এমএলএসএস পদেও রয়েছে বড় ঘাটতি। বর্তমানে সাতজন আউটসোর্সিং কর্মীর মাধ্যমে জরুরি সেবা চালু রাখা হয়েছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৫০০ জনের বেশি রোগী ভর্তি হলেও ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৭৫০ থেকে ৮০০ জনে দাঁড়িয়েছে।
দুর্গম এলাকায় মাত্র একজন ধাত্রী এবং বিশেষজ্ঞ গাইনি চিকিৎসকের অভাবে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যরাতে প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে রোগীদের পড়তে হয় চরম বিপাকে।
হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা যায়, ভর্তি রোগীদের চাহিদা মেটাতে শুধু স্যালাইন ও ইনজেকটেবল অ্যান্টিবায়োটিক বাবদ বছরে প্রায় ৭৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। এর বাইরে অন্যান্য ওষুধ এবং বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগের ওষুধের চাহিদাও রয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও দুর্গমতার কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এখানে থাকতে চান না। ফলে স্থানীয় মানুষ উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় দুর্গম এলাকায় কর্মরত চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, নিরাপদ আবাসন এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
হাওর বছরের ছয় মাস জলমগ্ন থাকে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। এটি বিবেচনায় নিয়ে ভাসমান নৌ-হাসপাতাল চালুর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মাধ্যমে দুর্গম এলাকার প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
এছাড়া সন্ধ্যার পর ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় রাতে অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তাই জরুরি রোগী পরিবহনে ফেরি চলাচল ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যদিকে স্ট্রোক, ট্রমা (মস্তিষ্কে আঘাত), দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য হাওরাঞ্চলে একটি টারশিয়ারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবিও উঠেছে।
পরিকল্পিত স্বাস্থ্যব্যবস্থাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। নতুন পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা, মাতৃ ও শিশুসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, জরুরি রোগী পরিবহনে নৌপথ ও ফেরির কার্যকর ব্যবস্থা করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রণোদনা ও আবাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবু বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে চিকিৎসকদের অনীহা দূর করতে ‘হাওর ভাতা’ বা বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে সিস্টার ও বয় নিয়োগ করা হলে তারা নিজ বাড়িতে থেকেই কাজ করতে পারবেন, ফলে আবাসন সংকট দেখিয়ে চলে যাওয়ার প্রবণতা কমবে। এছাড়া অন্তত পাঁচ বছর মেয়াদে দক্ষ আউটসোর্সিং লোকবল নিয়োগ করা হলে বেকারত্ব হ্রাসের পাশাপাশি হাসপাতালের জনবল সংকটও কাটবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অবহেলিত হাওরাঞ্চলের সব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ‘স্বতন্ত্র হাওর মন্ত্রণালয়’ গঠনের কোনো বিকল্প নেই।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ মো. মহিবুল্লাহ বলেন, “এত সংকট সত্ত্বেও আমরা মানবসেবার মানসিকতা নিয়ে শ্রম, মেধা ও আন্তরিকতা দিয়ে হাওরবাসীকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, ‘হাওর অঞ্চলে কর্মকর্তাদের কিছুটা অনীহা রয়েছে, তবে এই সংকট আর থাকবে না। সরকার স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে লোকবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই উল্লেখযোগ্য সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।’
— এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-544ca1-720x405.webp)