রাজবাড়ীর উদ্যোক্তা হাকিমের গোল্ডেন জুটপণ্য

এক সেলাই মেশিনে শুরু, এখন রপ্তানি ২৬ দেশে

এক সেলাই মেশিনে শুরু, এখন রপ্তানি ২৬ দেশে
পাট, হোগলা পাতা, খড় ও কচুরিপানা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পণ্য। ইনসেটে উদ্যোক্তা আব্দুল হাকিম সরদার। ছবি: আমার দেশ

গ্রামের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে শুরু। একটি সেলাই মেশিনই ছিল সম্বল। সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ রূপ নিয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠানে। পাট, হোগলা পাতা, কচুরিপানা, ধানের খড় ও ছনসহ দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে দুই শতাধিক ধরনের পণ্য। দেশের বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য এখন রপ্তানি হচ্ছে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের অন্তত ২৬টি দেশে। রাজবাড়ীর সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের ভবদিয়া গ্রামের গোল্ডেন জুট প্রোডাক্টের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছেন উদ্যোক্তা মো. আব্দুল হাকিম সরদার।

২০০৮ সালে মাত্র একটি সেলাই মেশিন দিয়ে পাটজাত পণ্য তৈরির কাজ শুরু করেন আব্দুল হাকিম সরদার। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে একটি ফোন কোম্পানিতে চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। সেখানে প্রায় ১২ বছর চাকরি করার পর ব্যবসায় আসার চিন্তা মাথায় আসে তার। এক বন্ধুর পরামর্শ ও উৎসাহে পাটজাত পণ্য তৈরি করে ভারতে পাঠানোর উদ্যোগ নেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় তার উদ্যোক্তা জীবনের পথচলা।

বিজ্ঞাপন

প্রথম দিকে ফ্লোরম্যাট ও পাপোশ তৈরি করে ঢাকার বিভিন্ন সুপারশপে বিক্রি করতেন আব্দুল হাকিম। পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে কর্মী ও মেশিনের সংখ্যা বাড়ান। একপর্যায়ে সাভারের একটি ভাড়া বাসায় লোকবল বাড়িয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যান। ব্যবসার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

এরপর ভবদিয়া গ্রামে নিজের বাড়ির পাশে ঘর নির্মাণ করে ৫০টি মেশিন নিয়ে শুরু হয় উৎপাদন। স্থানীয় বেকার তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয় সেখানে। সময়ের সঙ্গে দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে উৎপাদন ও ব্যবসার পরিধিও।

গোল্ডেন জুট প্রোডাক্টে পাটের পাশাপাশি হোগলা পাতা, কচুরিপানা, ধানের খড়, ছনসহ বিভিন্ন দেশীয় ও প্রাকৃতিক কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়। এসব উপকরণ দিয়ে ম্যাট, কার্পেট, মাদুর, ডাইনিং টেবিল ম্যাট, ঝাঁকা, টুপি, বাস্কেট, জায়নামাজ, ফুলের টব, ছিঁকা, বাজারের ব্যাগ, শপিং ব্যাগ ও শোপিসসহ অন্তত দুই শতাধিক ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত পণ্য দেশের বাজারে বিক্রির পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে গোল্ডেন জুটের পণ্য।

গোল্ডেন জুট প্রোডাক্টের পাশাপাশি আব্দুল হাকিম সরদার গড়ে তুলেছেন গোল্ডেন জুট মিল, গোল্ডেন ডাইং, চটমিল, জুট ডাইভার্সিফাইড মিল এবং গোল্ডেন প্লাস ফুড অ্যান্ড বেভারেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান লিমিটেড কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুল হাকিম সরদার নিজে।

গত ২৯ আগস্ট রাজবাড়ী শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ভবদিয়া গ্রামের গোল্ডেন জুট প্রোডাক্টের উৎপাদনকেন্দ্রে কথা হয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হাকিম সরদারের সঙ্গে। তিনি জানান, তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় চার হাজার মানুষ কাজ করছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় বেকার তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষও কাজ করছেন। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠার ফলে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে বেকারত্বও অনেকটা কমেছে।

তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় কোনো বেকার ছেলে-মেয়ে নেই। অনেক প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষও এখানে কাজ করেন। এলাকার মানুষের জন্য কিছু করতে পেরে আমি গর্বিত।

গোল্ডেন জুটের উৎপাদন ব্যবস্থায় যুক্ত রয়েছে ৪০টি সাব-সেন্টার। কারখানা থেকে সুতা, হোগলা পাতা ও খড়সহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এসব সাব-সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখানে গ্রামের নারী-পুরুষরা পণ্য তৈরি করেন। পরে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গাড়িতে করে তৈরি পণ্যগুলো আবার কারখানায় নিয়ে আসা হয়।

তবে সাফল্যের পাশাপাশি নানা সংকটও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন আব্দুল হাকিম। তিনি জানান, গোল্ডেন জুট প্রোডাক্টের অনুকূলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন হয়েছিল। এর একটি অংশ পাওয়ার পর ব্যাংকটি আর্থিক সংকটে পড়ায় প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল আর পাওয়া যায়নি। ফলে উৎপাদন ও ব্যবসা সচল রাখতে এখন অন্য ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

উদ্যোক্তা হাকিম সরদার বলেন, অর্থের সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম আরো বাড়াতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট একটি ঘরে মাত্র একটি সেলাই মেশিন দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান। পাশাপাশি দেশের পাটজাত পণ্যের বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সরকারি সহায়তা পেলে ভবদিয়ার এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আরো বড় পরিসরে দেশীয় পণ্যকে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দিতে পারবেন বলে জানান উদ্যোক্তা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন