নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট চলছে। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ না থাকায় শত শত টেক্সটাইল, ডাইং মিল, সিরামিক ও অন্যান্য মাঝারি-ভারী কারখানা এবং সিএনজি স্টেশনের উৎপাদন ও কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে এই দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র জ্বালানি ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল নরসিংদীতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সারা দেশের কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দিয়ে থাকে নরসিংদীতে তৈরি কাপড়। এ জেলায় টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। গ্যাস–সংকটের কারণে বেশ কিছু কারখানা উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
গত কিছুদিন ধরে একের পর এক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা দুর্যোগের সংকট কাটিয়ে ব্যবসায়ীরা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায়, ঠিক সেই মুহূর্তে জ্বালানি খাতের এই মুহূর্তের চরম সংকট তাদের হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে উদ্যোক্তাদের মতে, শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের প্রাপ্তি ও বিদ্যুতের লোডশেডিং মাত্রারিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ী নেতারা জানান, জ্বালানির এই নজিরবিহীন শূন্যতার কারণে নরসিংদীর শিল্পজোনে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। ডাইং, প্রিন্টিং, টেক্সটাইল এবং স্পিনিং মিলের উৎপাদন প্রায় পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিগত অর্থবছর শেষ হয়ে একটি মাস পেরিয়ে নতুন মাসে প্রবেশ করলেও উৎপাদনের চাকা বন্ধ থাকায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন কারখানা মালিকরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক উদ্যোক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, কারখানায় কোনো উৎপাদন নেই, তাই বিক্রিও বন্ধ। এই অবস্থায় কোনো কারখানা মালিকের পক্ষেই শ্রমিক-কর্মচারীদের মাসিক বেতন পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালন্ডার মিলসের পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া জানান, এখন গ্যাস সংকটে দুই সপ্তাহ ধরে কারখানার উৎপাদন প্রায় বন্ধ রয়েছে। কারখানাটি চালাতে গ্যাসের ন্যূনতম ১০ পিএসআই চাপ প্রয়োজন। পাওয়া যাচ্ছে মাত্র এক থেকে দুই পিএসআই। এত কম চাপে উৎপাদন রাখা যায় না। রাতে সিলিন্ডার গ্যাসের সাহায্যে এক-দুই ঘণ্টা কারখানা চালু রাখা সম্ভব হয়।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশন নরসিংদীর চেয়ারম্যান ও মাধবদী ডাইং ফিনিশিং মিলস লিমিটেডের মালিক নিজাম উদ্দিন ভূইয়া লিটন (সিআইপি) জানান, বাংলাদেশের ৭৫ ভাগ কাপড়ের চাহিদা পূরণ করে থাকে নরসিংদীতে তৈরি কাপড়। এখন গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায়, নরসিংদী ও মাধবদী এলাকার প্রায় ৮০ ভাগ মিল বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর মুখপাত্র নরসিংদীর আবেদ টেক্সটাইল প্রসেসিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে নরসিংদীর শিল্পজোনে। দেশের বিগত সময়ের প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা দুর্যোগের ভয়াবহতায় ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যেই হতাশাগ্রস্ত। এর ওপর এখন বিদ্যুতের যে অতিরিক্ত লোডশেডিং ও গ্যাসের মারাত্মক সমস্যা। আগে আমরা যেখানে বলতাম এগুলোর স্বল্পতা, এখন হচ্ছে শূন্যতা। গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখন যে শূন্যতা বিরাজ করছে, তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে একসময় জনরোষ তৈরি হতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

