রায়পুরায় নিখোঁজ হলেই মিলছে লাশ, জনমনে আতঙ্ক

রায়পুরায় নিখোঁজ হলেই মিলছে লাশ, জনমনে আতঙ্ক

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় একের পর এক নিখোঁজ ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। নিখোঁজ হওয়ার পর কেন জীবিত উদ্ধার করা যাচ্ছে না, এসব ঘটনায় কারা জড়িত—এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বয়সী পাঁচজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পুলিশ বলছে, কিছু ঘটনায় অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালকদের হত্যা করার তথ্য পাওয়া গেছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলেও অনেক ক্ষেত্রে পরে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। এসব ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের শনাক্ত এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ গত ১৯ অক্টোবর রায়পুরার শ্রীনগর ইউনিয়নের ভেলুয়ারচর এলাকায় একটি খালের পাড়ের ঝোপ ও কচুরিপানার ভেতর থেকে তারেক (১২) নামে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে ওই গ্রামের মালয়েশিয়াপ্রবাসী জিয়াউর রহমানের ছেলে। পরিবারের ভাষ্য, গত ১৫ অক্টোবর নিজের সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তারেক। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।

এর এক দিন আগে, ১৮ অক্টোবর সকালে উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের হাসনাবাদ এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে আরমান ফকির (২৪) নামে এক যুবকের গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি ভাটিবদরপুর এলাকার সালাহউদ্দিন ফকিরের ছেলে। স্বজনদের ভাষ্য, গত ১১ অক্টোবর বাড়িতে অটোরিকশা চার্জ দিয়ে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন আরমান।

গত ১৩ অক্টোবর উপজেলার মরজাল ইউনিয়নের আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে রহমত উল্লাহ (১৮) নামে এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি চর মরজাল গ্রামের পশ্চিমপাড়ার জামাল মিয়ার ছেলে। রহমত উল্লাহ মানসিক ও বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিলেন। পরিবারের দাবি, নদীতে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে ৫ অক্টোবর উপজেলার আদিয়াবাদ ইউনিয়নের বড়বিল এলাকা থেকে কচুরিপানার মধ্যে মনির হোসেন (১৭) নামে এক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকের লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি চরসুবুদ্ধি ইউনিয়নের শাহ আলম মিয়ার ছেলে। জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা নিয়ে বের হওয়ার পর গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলেন মনির।

এ ঘটনায় পরিবারের করা মামলার তদন্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাগপাড়া ও কুমিল্লার লালমাই থেকে দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মনিরের অটোরিকশার চারটি ব্যাটারিও উদ্ধার করা হয়। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই মনিরকে হত্যা করা হয়েছিল।

এ ছাড়া গত ২৯ জুন রায়পুরার পাড়াতলী ইউনিয়নের মধ্যনগর এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় সাত বছর বয়সী শিশু তাসকিয়া। চার দিন পর বাড়ির পাশের একটি জমি থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।

একাধিক ঘটনায় লাশ উদ্ধারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

এ বিষয়ে রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মজিবুর রহমান বলেন, থানায় নিখোঁজের জিডি হলে পুলিশ গুরুত্বসহকারে তদন্ত শুরু করে। নিখোঁজ ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হলে এবং মুঠোফোন ব্যবহার করলে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি তার সঙ্গে চলাফেরা করা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদসহ বিভিন্নভাবে খোঁজ চালানো হয়।

ওসি আরও বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই অটোরিকশাচালক। বেশি ভাড়ার প্রলোভন দেখিয়ে চালকদের নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে অটোরিকশাচালকদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

রায়পুরা ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন বলেন, রায়পুরায় একের পর এক নিখোঁজ ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ ধরনের ঘটনা রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, এলাকাবাসীকে সচেতন থাকতে হবে। সন্দেহজনক কোনো ঘটনা দেখলে পুলিশকে জানাতে হবে এবং কোনো গুজবে কান দেওয়া যাবে না। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

রায়পুরায় ধারাবাহিক এসব ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত খুঁজে বের করা, প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে জনমনে নিরাপত্তার আস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন