কোথাও ১২ কোথাও ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং

কোথাও ১২ কোথাও ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। দিনের বেলায় বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরে কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে জুন ও জুলাই মাসে অস্বাভাবিকভাবে বেশি বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার স্বাভাবিকের তুলনায় কম হলেও অনেকের বিল আগের মাসগুলোর তুলনায় কয়েক গুণ বেশি এসেছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করেও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সমাধান মিলছে না বলে দাবি করেছেন গ্রাহকেরা।

শিবচর পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলার চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ অনেক কম। দিনে শিবচরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৮ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১২ মেগাওয়াট। রাতে চাহিদা বেড়ে প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যায় ১৭ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের বড় ঘাটতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসায়ীরা। উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দোকানপাটে ক্রেতার উপস্থিতি কমেছে। ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফটোকপি ও কম্পিউটার ব্যবসা, মোবাইল সার্ভিসিং, কোল্ড ড্রিংকস ও ফ্রিজনির্ভর ব্যবসাসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কাজের সময় নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদন কমছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে জেনারেটর বা বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। পাশাপাশি ভোল্টেজ ওঠানামায় ফ্রিজ, মোটর, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

লাভলুজ্জামান নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, হঠাৎ করে ১০ দিন ধরে লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। দোকানে বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতারা বসতে চান না। বিদ্যুৎনির্ভর কাজগুলোও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একদিকে ব্যবসার ক্ষতি, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিলও প্রচুর বেড়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও ইজিবাইকচালকদের ওপরও। রাতে ব্যাটারি চার্জ দিতে না পারায় দিনের বেলায় অনেক চালক ঠিকমতো যানবাহন নিয়ে বের হতে পারছেন না। ফলে কমেছে তাদের আয়।

পাচ্চর ইউনিয়নের ভ্যানচালক ফয়সাল বলেন, রাতে ভ্যানের ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ দিতে পারি না। সারা রাতে এক ঘণ্টাও টানা বিদ্যুৎ থাকে না। দিনের বেলায় ভ্যান নিয়ে বের হওয়া যায় না ঠিকমতো। আগে দিনে প্রায় ৭০০ টাকা আয় হতো, এখন ২০০ টাকা আয় করার আগেই ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে যায়।

বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে ঘরেও থাকতে পারছেন না অনেকে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে মানুষকে দোকান, রাস্তার পাশে কিংবা খোলা জায়গায় সময় কাটাতে দেখা গেছে। রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক পরিবারকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে। এ ছাড়া মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া, পানির মোটর চালানো, ফ্রিজে খাবার সংরক্ষণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে পরিবারগুলো।

শিবচর পৌরসভা এলাকার বাসিন্দা সোবাহান মিয়া বলেন, সাধারণত প্রতি মাসে আমার বিদ্যুৎ বিল ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে থাকে। কিন্তু এ মাসে বিল এসেছে ১ হাজার ৯০০ টাকা। একদিকে ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাচ্ছি না, অন্যদিকে বাড়তি বিল দিতে হচ্ছে। বিষয়টি খুবই কষ্টকর।

জুন মাস থেকে কার্যকর হওয়া নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফের পর অনেক গ্রাহকের বিল আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, শুধু ট্যারিফ বৃদ্ধির কারণে নয়, অনেকের বিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি এসেছে। জুন ও জুলাই মাসে স্বাভাবিক ব্যবহারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল পাওয়ার দাবি করছেন কেউ কেউ।

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি বিলের বোঝা আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ না করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বাড়তি বিল নিয়ে আপত্তি থাকলেও অনেককে বাধ্য হয়ে বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। গ্রাহকদের দাবি, যেসব মিটারে অস্বাভাবিক বিল এসেছে সেগুলো পুনঃপরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে। একই সঙ্গে মিটার রিডিং ও বিল তৈরির প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল বা অসংগতি থাকলে তা তদন্ত করে সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি বিদ্যুতের ভোল্টেজ ওঠানামা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, হঠাৎ বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া এবং ভোল্টেজের অস্বাভাবিক ওঠানামায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও রয়েছে।

শিবচর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার জহিরুল হক বলেন, চাহিদার তুলনায় আমরা অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছি। এই সীমিত সরবরাহে লোডশেডিং ছাড়া শিবচরের সব এলাকায় একযোগে বিদ্যুৎ সংযোগ সচল রাখা সম্ভব নয়। সমস্যার স্থায়ী সমাধান কবে হবে, সে বিষয়ে এখনো আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগের বিষয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন