অতিবৃষ্টিতে দ্রুত পেকে নষ্ট আনারস, বিপাকে চাষিরা

অতিবৃষ্টিতে দ্রুত পেকে নষ্ট আনারস, বিপাকে চাষিরা
টাঙ্গাইলের মধুপুরে সম্প্রতি আনারস বাগান পরিদর্শন করেন কৃষি কর্মকর্তারা। ছবি: আমার দেশ

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার প্রধান অর্থকরী ফসল হচ্ছে আনারস। এ আনারসের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক। এতে আনারসচাষিদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টির কারণে আনারস নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। বৃষ্টিতে আনারস দ্রুত পেকে যাচ্ছে। ফলে গ্রাহক সংকটে দ্রুত বাজারজাত করতে পারছেন না।

জানা গেছে, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এ উপজেলার ইদিলপুরে আনারসের চাষ শুরু হলেও বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষাবাদ। এ বছর আনারসের উৎপাদন হয়েছে অন্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। আনারসের ভরা মৌসুমে এসে অধিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে আনারস একসঙ্গে পেকে যাওয়ায় বাজারে আমদানি বেশি। আর এ কারণে বাড়তি গ্রাহক না থাকায় দাম পাচ্ছেন না কৃষকেরা। আর এ কারণে অসন্তুষ্ট চাষিরা।

বিজ্ঞাপন

কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের অন্যতম আনারস উৎপাদনের এলাকা মধুপুরে চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ছয় হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ক্যালেন্ডার (জায়ান্ট কিউ) জাতের আনারস চার হাজার ৩০৭ হেক্টরে, জলডুগি দুই হাজার ৩১৮ হেক্টরে এবং এমডি-২ জাতের আনারস ১০ হেক্টরে চাষ করা হয়েছে। এ মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ টন আনারস উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শালবন আর আনারসের জনপদ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লালমাটির মধুপুর গড়াঞ্চল। এখানকার আবহাওয়া ও মাটির প্রকৃতি আনারস চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী হওয়ায় আনারস চাষ করা যায় অতি সহজে। ভূমির প্রকৃতি সমতল ও উঁচু হওয়ায় এখানে বন্যার পানি উঠে না। আবার ছোট নালা দিয়ে পানি সহজে সরে যাওয়ায় জলাবদ্ধতাও হয় না। মাটির বিশেষ গুণের কারণে এখানে আনারস ও কলার ফলন হয় চমৎকার। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী এ বছর মধুপুর উপজেলায় প্রায় ৯ থেকে সাড়ে ৯০০ কোটি টাকার আনারস বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু যদি সঠিক সময়ে বিক্রি করতে না পারা যায় তাহলে লোকসানের ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন অনেক কৃষক। আর তেমনি চিত্র ইতোমধ্যে চোখে পড়ছে বিভিন্ন বাজারে গিয়ে। এ বিশাল সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে আধুনিক বিপণনব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জুন, জুলাই, আগস্ট মাস আনারসের ভরা মৌসুম চলছে। আর এরই মধ্যে শুরু হয় অতিবৃষ্টি। একসঙ্গে আনারস পেকে যাওয়ায় বাজারে আমদানি বেড়েছে চাহিদার তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ। বিপাকে পড়েছেন হাজারো কৃষক। ফলে গত বছরের তুলনায় কম দামে চাষিদের আনারস বিক্রি করতে হচ্ছে।

উপজেলার মহিষমারা গ্রামের কৃষক ছানোয়ার হোসেন জানান, এ বছর গত বছরের তুলনায় আনারস চাষ হয়েছে বেশি। আর ভরা সিজনের সময় অতি বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে পুরো বাগানের আনারস পেকে যাচ্ছে। তাই বাজারে আমদানি বেশি। কিন্তু আমদানির তুলনায় বাড়েনি গ্রাহক। রাসায়নিকের ব্যবহারে দাম কমে যাওয়ার অভিযোগটি সত্য নয়। নিরাপদ আনারস চাষের জন্য কৃষকরা দিনরাত কাজ করছি।

শালিকা গ্রামের আনারস চাষি জাহিদুল ইসলাম জানান, আনারস উঠার মৌসুমের শুরু থেকেই বৃষ্টির কারণে বেশি পরিমাণে আনারস পেকে যাওয়ায় বাজারে আমদানি বেড়েছে। আর এ কারণে গত বছরের চেয়ে দাম একটু কম পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু লোকসান হচ্ছে না।

জলছত্র বাজারের আড়তদার মনির হোসেন বলেন, আমরা এ বাজার থেকে সারা বছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস, কাঁঠাল, কলাসহ বিভিন্ন কাঁচামাল পাঠাই। এ বছর শুরুতে আনারসের বাজার ভালো থাকলেও বর্ষা মৌসুমে বেশি পরিমাণে বৃষ্টি হওয়ায় এখন দাম একটু কম। তাছাড়া বাগানভর্তি আনারস পেকে যাওয়ায় বাজারে আমদানি বেড়েছে। পাইকার আগের মতোই। তাই দাম বাড়ছে না।

মহিষমারা গ্রামের কৃষক সাজ্জাদ রহমান জানান, আনারস চাষিরা মূলত আনারসের আকার বড় করতে প্যানোফিক্স, ক্রপকেয়ার, বোরণ নামক গ্রোথ হরমোন ব্যবহার করা হয়। যার ফলে আনারসের আকার বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কিছু কিছু কৃষক মাত্রাতিরিক্ত স্প্রে করে আনারস পাকিয়ে বাজারজাত করেন।

কেউ কেউ বলেন, স্বাভাবিকভাবে ২৪ মাসে যেখানে একটি গাছে ফল ধরে কিন্তু এসব ব্যবহারের কারণে সেখানে ১৮ মাসেই চারা গাছে ফল ধরানো যায়।

এ বিষয়ে মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, অন্যান্য পচনশীল কৃষিপণ্যের মতোই আনারসের বাজার আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। গত বছরের তুলনায় এ মৌসুমে আনারসের দাম কম থাকার মূল কারণ হলো অতিবৃষ্টিতে একসঙ্গে বাগানের আনারস পেকে যাওয়া। রাসায়নিকের ব্যবহারে গ্রাহক হারানো ও দাম কমে যাওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। তবে স্বাদের কিছুটা তারতম্য হওয়াটা স্বাভাবিক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরাপদ খাদ্য প্রকল্পভিত্তিক ও প্রকল্পের বাইরে মোটিভেশনাল কার্যক্রমের আওতায় মধুপুর কৃষি অফিসের সব কর্মকর্তা সুষম সার ও অনুমোদিত মাত্রায় রাসায়নিক প্রয়োগে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন