কেশবপুরে কেমিক্যাল কারখানার বর্জ্যে হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

ওয়াজেদ খান ডবলু, কেশবপুর (যশোর)

কেশবপুরে কেমিক্যাল কারখানার বর্জ্যে হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য
ছবি: আমার দেশ

যশোরের কেশবপুরে অবৈধ কেমিক্যাল কারখানায় রাসায়নিক বর্জ্যে ফসলের ক্ষেত, গবাদিপশু, পাখি, গাছপালা, জনস্বাস্থ্য এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। অ্যাসিড ও রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্যে এলাকার পানি ও মাটির রঙ লালবর্ণ হয়ে গেছে। পরিবেশ দূষণের দুর্গন্ধে নারী-পুরুষ ও শিশুরা চর্ম ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ওই অবৈধ কারখানা বন্ধ করে এর মালিক রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে আইনগতব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে আবেদন করেছেন দুই গ্রামের ৬০ পরিবার।

অভিযোগে জানা গেছে, যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় গ্রামের রুহুল আমিন বেশি মুনাফার আশায় গত তিন বছর আগে কেশবপুর সদর ইউনিয়নের কেশবপুর-ভরতভায়না সড়ক-সংলগ্ন খতিয়াখালী গ্রামে লোহার ফ্লাটবার, স্কয়ারবার, প্লেন শিট ও অ্যাঙ্গেলসহ বিভিন্ন লোহার সামগ্রী, অ্যাসিড ও কেমিক্যাল দিয়ে রঙ করার একটি কারখানা স্থাপন করেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতিসহ পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়াই এ কারখানায় যত্রতত্র অ্যাসিড, ভারতীয় বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে চলেছেন। এর চারপাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ একাধিক বসতবাড়ি থাকলেও তিনি তার কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার না রেখে অ্যাসিড ও রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্য খোলামেলা পরিবেশে প্রবেশ করছে। এখানে প্রতি ঘণ্টায় হাজার হাজার লিটার রাসায়নিকযুক্ত পানি প্রতিবেশীদের উঠানে এবং কৃষকের ফসলের ক্ষেতে ফেলা হচ্ছে। এতে আমগাছ, নারকেলগাছ, সুপারি, কলা ক্ষেতের পাতা পুড়ে মারা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বর্ষাকালে ওই দূষণের মাত্রা বেড়ে আশপাশের প্রায় ২০ একর জমি রাসায়নিক পানিতে ছয়লাব হয়ে যায়। ওইসব ফসলের ক্ষেতে নামলে কৃষকের পায়ের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে এবং কারখানার শব্দ দূষণে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে।

অতিরিক্ত মুনাফার লোভে রুহুল আমিন তার কারখানায় প্রকাশ্যে কালো ফ্লাটবার ও অ্যাঙ্গেল ৮৫ টাকা কেজিতে কিনে এনে সেখানে বিভিন্ন ভারতীয় রাসায়নিক পদার্থ চোরাইপথে এনে ওই রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে তা বিভিন্ন রডে জিয়াই (সাদা) রং করে কেজিতে ৩০-৩৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন। এ প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তিনি রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। একটি কারখানা থেকে তিনি বর্তমানে কেশবপুর ও মনিরামপুরে তিনটি কারখানা স্থাপন করেছেন। কেশবপুর পৌর শহরে চারতলা আলিশান বাড়ি এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সূত্র জানায়, পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়াই ওই কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। এলাকার চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে তিনি ওই প্রতারণার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তেক্ষপ কামনা করেছেন খতিয়াখালী ও মাগুরাডাঙ্গাসহ দুই গ্রামের মানুষ। প্রতিবেশী বৃদ্ধ নিছার আলি বলেন, কারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত পানিতে তার পাঁচটি আমগাছ, দুটি নারকেল গাছ, ২০টি সুপারি গাছসহ একাধিক ফলদ ও বনজ গাছের পাতা পুড়ে মারা যাচ্ছে। এর প্রতিবাদ করলে কারখানার মালিক বিভিন্ন মামলায় ঢুকানোর ভয় দেখায়।

খতিয়াখালী গ্রামের শিক্ষক ওরশন আলি বলেন, কারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে পানি ও মাটির রং লালবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কারখানার পানি বাড়ি ও ফসলের জমিতে ফেলা হচ্ছে। এর দুর্গন্ধ এবং রাসায়নিক পানিতে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকার মানুষ। যা দেখার কেউ নেই।

কারখানার মালিক রুহুল আমিন বলেন, রাসায়নিক কারখানায় একটু দূষণ তো হবেই। এছাড়া তার কারখানা স্থাপনে সরকারি কোনো অনুমতি না থাকলেও তার কারখানায় ১০১ জন শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেকসোনা খাতুন বলেন, অবৈধ রাসায়নিক কারখানার বিষয়ে এলাকাবাসীর অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন