খুলনার পাইকগাছায় কপোতাক্ষ নদে ডিঙি নৌকায় বাঁধা ছোট্ট এক সুখের নীড়। সেই নীড়েই কয়েক যুগ ধরে বসবাস সুখেন বিশ্বাস ও তার স্ত্রী নমিতার। বিশাল এই পৃথিবীর কোথাও তাদের স্থায়ী ঠিকানা হয়নি। সব হারিয়ে প্রিয়তমা স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নদে ভাসমান জীবনই এখন তাদের নিয়তি।
বোয়ালিয়া গ্রামের সোহরাব হোসেন জানান, যৌবনেই কপোতাক্ষ তাদের ভিটেমাটি কেড়ে নিয়েছে। সেই থেকে ঘরছাড়া সুখেন। মাটি আঁকড়ে থাকতে না পারলেও যে কপোতাক্ষ তাদের সব কেড়ে নিয়েছে, সেই নদই আজ তাদের ঠিকানা।
ভাসমান দম্পতির এই ছোট্ট নীড় যেন মাটির স্পর্শ ছাড়াই গড়ে ওঠা এক সংসার। সেখানে সন্ধ্যায় জ্বলে প্রদীপ। ভোরের আলোয় ঘুম ভাঙে দুজনের। অকৃত্রিম ভালোবাসার বয়স পেরিয়েছে অর্ধশতাব্দী। নদের কুলকুল শব্দ আর ছোট ছোট ঢেউয়ের সঙ্গে তাদের প্রতিদিনের জীবন যেন এক দীর্ঘ হানিমুন।
তেল-গ্যাসহীন বাহন ডিঙি নৌকা। যত দূরেই যাক, ঠিকানা একটাই—‘কেয়ার অব কপোতাক্ষ’। সেঞ্চুরির পথে হাঁটছেন সুখেন বিশ্বাস। নমিতাও একই পথের যাত্রী। অস্থিচর্মসার এ দুই মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল সেই ডিঙি নৌকা। যে নৌকায় তাদের বসবাস, সেই নৌকাতেই ক্ষুধা মেটানোর ব্যবস্থা। সৃষ্টিকর্তাই তাদের একমাত্র ভরসা।
কপোতাক্ষের মিঠাপনিতেই খাবারের সন্ধান করেন তারা। প্রতিদিন নদে মাছ ধরে চলে জীবন। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে যতটুকু মাছ পাওয়া যায়, তা বিক্রি করেই কোনোভাবে সংসার চলে।
বয়সের ভারে সুখেনের মাথা নুয়ে এসেছে। শরীরও আগের মতো সায় দেয় না। কোনো দিন আধাপেটা খেয়ে থাকতে হয়, কোনো কোনো দিন চুলায় আগুনই জ্বলে না। বেশির ভাগ সময় চিড়া, মুড়ি, বিস্কুটই তাদের ভরসা।
বৈরী আবহাওয়া, ঝড়ঝঞ্ঝা আর তপ্ত রোদ যেন তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও সুখেনকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন নমিতা। দুজনের এই গভীর ভালোবাসায় একে অন্যের অসুস্থতায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠারও শেষ নেই।
একসময় পাইকগাছা উপজেলার বোয়ালিয়া মালোপাড়ায় তাদের সবই ছিল—ঘরবাড়ি, বাগ-বাগিচা, গরু, জমিজমা। কিন্তু নদ সব কেড়ে নিয়েছে। ‘এটা আমার নিয়তি। সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা—সাঁখা-সিঁদুর নিয়ে যেন মরতে পারি।’ কথাগুলো বলেন এই সাহসী যোদ্ধা নমিতা।
মালোপাড়ায় তাদের এক মেয়ে থাকেন। মাঝেমধ্যে প্রাণের টানে সেখানে ছুটে যান তারা। এমনই এক সময়ে মালোপাড়া ঘাটের কাছে দেখা মেলে সুখেন-নমিতা দম্পতির।
এখন আর কপোতাক্ষে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। মাছের সন্ধানে যেতে হয় অনেক দূরে। ঘাটে নৌকার দড়ি খুলতে খুলতে সুখেন বলছিলেন, ‘যদি বেঁচে থাকি, কথা হবে অন্যদিন।’
এরপর আবার দড়ির গিঁটের সঙ্গে যেন জীবনের গিঁট খুলে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে বেরিয়ে পড়েন সুখেন। নদের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেন মাছের সন্ধানে। কপোতাক্ষের ঢেউয়ে ভেসে চলে তার ভালোবাসা। নদের পানির সঙ্গে মিশে যায় নোনা ঘামের গন্ধ।
স্বার্থের এই দুনিয়ায় আপন বলতে তাদের তেমন কেউ নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কি সুখেন-নমিতা দম্পতির ভাগ্যে জুটবে না একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই?
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া সুখেনের জন্য নদে মাছ ধরা দিনে দিনে কঠিন হয়ে উঠছে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগও তাদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে। অথচ ভাসমান এই ডিঙি নৌকাই তাদের স্বপ্নের সোনালি নীড়, ভালোবাসার আশ্রয়।
হয়তো জীবনের শেষ যবনিকাও নামবে এই কপোতাক্ষের বুকে। সভ্য সমাজে সুখেনের এই ভাসমান নীড়েই যদি জীবনের শেষ সংলাপ লেখা হয়, সেই দায় কার?
সুখেন-নমিতা দম্পতির এখন প্রয়োজন শুধু একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই। চিতায় ওঠার আগেই তাদের ঠিকানা থেকে যেন মুছে যায়—‘কেয়ার অব কপোতাক্ষ’। তবেই হয়তো ফিরবে তাদের স্বস্তি, আর প্রমাণিত হবে—মানুষ সত্যিই সৃষ্টির সেরা।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

